ঢাকা শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন মানুষ

পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন মানুষ

নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট একটি হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করায় নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল শুক্রবার পানি উপচে পড়ার পর তীব্র বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে উদ্ধার তৎপরতাও কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে গত বুধবার নেপালের উত্তর সীমান্তে ভটোকোশী নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। এতে রসুলার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো লন্ডভন্ড হয়ে গেছে এবং বরফ মেশানো পানির তীব্র স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ নদীর নিচের দিকে ভেসে গেছে। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫২ জনে পৌঁছেছে। নেপালভিত্তিক সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট এ খবর জানিয়েছে। নিহতের এ সংখ্যার মধ্যে রসুলার স্থানীয় অধিবাসী এবং নদীর দূরবর্তী নিম্নাঞ্চল থেকে উদ্ধার করা লাশগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মৃতের এই সংখ্যাই যে চূড়ান্ত তা নয়। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জেলার প্রাপ্ত তথ্য ও রেকর্ড মিলিয়ে দেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনায় এখনও দেড় সহস্রাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

এদিকে নেপালের বন্যাদুর্গত রসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পরিয়ার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা একটি নোটিশ পেয়েছি, হ্রদের তীর ভেঙে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু এটি ঠিক কত বড় এবং পানির স্তর কতটা উঁচু, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীতে পানির স্তর বাড়ছে।’ রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাইকে সবাইকে নদী থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। আর রশি ও স্ট্রেচার নিয়ে প্রস্তুত অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন পুলিশের সদস্যরা।

৪০ বছর বয়সী শান্তি তামাং রয়টার্সকে বলেন, ‘সবাইকে ‘পালাও’ বলে সতর্ক করা শুরু হলে আমিও দৌড় দিলাম। বিদুর শহরের সাইরেনও বেজে উঠেছিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’ উদ্ধারকর্মীদেরও তাদের সরঞ্জামসহ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছিল।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের নির্দেশ চীনা প্রেসিডেন্টের

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি শুক্রবার জানিয়েছে, হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলে চীনের সব উদ্ধারকারী কর্মী ও যানবাহনকে পিছু হটে নিরাপদ এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়। অবশ্য পরে ‘উজানের নদীর মাধ্যমে হ্রদের ঝুঁকিটি সামলানো সম্ভব বলে মনে হওয়ায়’ উদ্ধারকাজ আবার শুরু করা হয়। নেপালের সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, নেপাল কর্তৃপক্ষ ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত রেখেছিল। পরে তা আবার শুরু করা হয়। বুধবারের বন্যা গ্রাম ও উপত্যকাগুলোকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট এবং সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করেছে সড়ক এবং তীর্থযাত্রীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সড়ক ধ্বংস হয়ে গেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৮০০ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী। তারা তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

উদ্ধারকাজ পরিচালনার কৌশল নিয়ে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে শুক্রবার চীনের পলিটব্যুরো বৈঠক করেছে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ‘বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং চীন ও বিদেশের নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।’ বৈঠকে বলা হয়, উদ্ধারকাজ ‘অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জের’ মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে হিমবাহ হ্রদ, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক বাঁধের নজরদারি জোরদার করা, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানানো হয়।

এর আগে নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বেঁচে যাওয়া মানুষদের খোঁজে অনুসন্ধান চালায়। বিভিন্ন শহর ও উপত্যকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষের জন্য আকাশপথে জরুরি ত্রাণ সরবরাহ করে।

অন্যদিকে জরুরি পরিষেবা দলগুলো সমতল ভূমিতে ভেসে আসা বহু মরদেহ উদ্ধার করেছে। অনুসন্ধানী দলে কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে। দিবগা তামাং ছিলেন রসুয়া থেকে গত বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া শেষ ব্যক্তিদের একজন, যাকে আরও তিনজনের সঙ্গে এয়ারলিফটে নুয়াকোটের একটি সেনাক্যাম্পে নেওয়া হয়। তামাং বলেন, ‘আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। সবাই মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ বেঁচে নেই। সবকিছু ও সবাই শেষ হয়ে গেছে। সব শেষ।’

বিদেশি উদ্ধার সহায়তা প্রত্যাখ্যান নেপালের

চারদিক থেকে সাহায্যের প্রস্তাব এলেও নেপাল জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘সাহায্যের প্রস্তাব আসাটাই স্বাভাবিক, তবে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আপাতত আমাদের এই ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’ সিউলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি র‍্যাপিড রেসপন্স টিম ইতিমধ্যেই কাঠমান্ডুতে অবস্থান করছে। কিন্তু নেপাল সরকার এখনো বিদেশি উদ্ধারকারীদের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা না করায়, তাদের মোতায়েন করা হয়নি।

‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে অভিযানে সহায়তা করার অনুমতি দিতে সরকারকে অনুরোধ করেছিল। চীন সীমান্তের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাণ্ডগিরোং সীমান্ত ক্রসিংয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারেননি বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কারণ, কর্মীরা ওই এলাকার প্রধান সংযোগ সড়ক থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছিলেন।

বুধবারের এক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কাদামাটি পানির বিশাল স্রোত এবং ধ্বংসাবশেষ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সীমান্ত ক্রসিং এলাকার একের পর এক অবকাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পলায়নরত মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চীনে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি গতকাল জানিয়েছে, তিব্বতের গিরোং কাউন্টিতে নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৫৫৮, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। এ পর্যন্ত চীনের অংশে মাত্র পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, চীনের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং গতকাল বিকেলে গিরোংয়ের দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছান।

চীন এই দুর্যোগকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, তাঁর এই পরিদর্শন সেটাই প্রমাণ করছে। বিশ্বজুড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা তাঁদের প্রিয়জনদের অবস্থান জানতে চরম ব্যাকুল হয়ে আছেন।

স্নেহা সুধীর ছিলেন সেই ১০ নারীর একজন, যাদের স্বামীরা নেপাল থেকে তিব্বতের কৈলাস পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। ঠিক তখনই অঞ্চলটি এই দুর্যোগের কবলে পড়ে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা। ভার্জিনিয়ার চ্যান্টিলিতে নিজের বাড়ি থেকে অশ্রুসজল চোখে স্নেহা সুধীর গতকাল বলেন, ‘তারা কোথায়?’ সুধীর জানান, নারীরা একে অপরকে মানসিকভাবে সমর্থন দিচ্ছেন। তাদের খবরের আশায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘কেউ কখনও এমন দৃশ্য দেখেনি, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী, মজবুত এবং ভালোভাবে তৈরি ভবনগুলো টুথপিকের (দাঁত খোঁচানোর কাঠি) মতো মুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এটি একটি ভয়াবহ ঘটনা। আমরা সাহায্য পাঠাচ্ছি এবং আমরা সেখানকার নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তাদের জানিয়েছি, তারা যা চাইবে, তাই পাবে।’

ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানায়, তিব্বত ও নেপাল সীমান্তের গিরংসংলগ্ন লেন্দে নদীতে পাহাড় ও কাদার স্তূপ ধসে পড়ায় এই বিপর্যয় শুরু হয়। পাহাড় ধসে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নেপালের ভাটি অঞ্চলে ভটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। রেড ক্রস জানিয়েছে, এই দুর্যোগে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। বিপর্যয় মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের সহায়তার আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত