ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দাম বাড়লেও বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট

দাম বাড়লেও বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট

দাম বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট কাটেনি। বরং সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির পরও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক লিটারের বোতলজাত তেল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও দোকানের তাকে তেল নেই, কোথাও আবার সীমিত পরিমাণে মিললেও চাহিদামতো দেওয়া হচ্ছে না। এরই মধ্যে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। গত বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দাম বাড়ানোর পর বাজারে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাবে— এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় সরবরাহ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিক বাজার পরিদর্শন ও বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংকট সবচেয়ে বেশি এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলে। দুই ও পাঁচ লিটারের বোতল কিছু এলাকায় পাওয়া গেলেও ছোট বোতলের সরবরাহ নিয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর শান্তিনগর, মৌচাক, মালিবাগ, রামপুরা ও কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় তেলের সরবরাহ ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।

দোকানে দোকানে খোঁজ, তবু মিলছে না

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে তারা ডিলারদের কাছে চাহিদামতো তেলের অর্ডার দিতে পারছেন না। অর্ডার দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কম পরিমাণে পণ্য পাচ্ছেন। ফলে দোকানে তেল আসার পরপরই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। একাধিক ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দাম সমন্বয়ের আগের কয়েক সপ্তাহ থেকেই সরবরাহে টান ছিল। নতুন দাম ঘোষণার পর সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও অনেক এলাকায় এখনো আগের পরিস্থিতিই রয়েছে। কোনো কোনো দোকানে নতুন দামের তেল না আসায় পুরোনো দামের মজুত তেলই বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের প্রশ্ন, সরকার যখন দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, তখন বাজারে পণ্যের সংকট কেন থাকবে? একই প্রশ্ন উঠেছে ব্যবসায়ী মহলেও। খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশের দাবি, তারা নিজেরা তেল আটকে রাখছেন না। সরবরাহকারী বা ডিলারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পণ্য না পাওয়ায় তাদের দোকানে তেল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরবরাহব্যবস্থার কোনো একটি স্তরে পণ্য আটকে রাখা বা কম ছাড়ার কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

২০৪ টাকা নির্ধারণ, কোথাও বেশি

সরকারের নির্ধারিত নতুন দামে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা। এর আগে এ দাম ছিল ১৯৯ টাকা। তবে বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ২০৪ টাকার তেল ৫ টাকা বেশি দামে বিক্রির তথ্য এসেছে। এর আগে মার্চেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। তখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এক লিটারের বোতল ২০০ থেকে ২১০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৯৭৫ থেকে ৯৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়। কোথাও দুই লিটারের বোতলের গায়েও লেখা দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। অর্থাৎ বাজারে তেলের সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক মাস পরপরই সরবরাহ কমে যাওয়া, দাম বাড়ানোর দাবি এবং এরপর নতুন দাম নির্ধারণ— এই চক্রের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।

দাম বাড়ানোর আগেই কেন সংকট?

বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে এখানেই। সরকার বলছে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দাম সমন্বয়ের দাবি করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯ টাকা থেকে ২০৪ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগে থেকেই কেন খুচরা বাজারে সরবরাহ কমে গেল? সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছিল না। একটি ভোজ্যতেল কোম্পানির কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে বিক্রি, হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিশোধন ও বাজারজাতকরণের নির্ভরতা এবং জ্বালানি-সংকটের কারণে কারখানা থেকে পণ্য পরিবহনে সমস্যা— এসব কারণে সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরবরাহ কমার পেছনে ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা।

সরকারের তথ্যমতে দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে

তেলের সংকট নিয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিযোগের বিপরীতে সরকারের বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন। ২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে এবং কোনো সংকট নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকেরা দাম সমন্বয়ের আবেদন করেছিলেন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও প্রতি লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় সরকার ৫ টাকা দাম বাড়িয়েছে। পরদিন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করেই ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। সরকারের এ বক্তব্যের সঙ্গে খুচরা বাজারের চিত্রের একটি পার্থক্যই এখন বড় আলোচনার বিষয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার দাবি করা হলেও খুচরা পর্যায়ে কেন ক্রেতাকে দোকান থেকে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে— তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

সরবরাহের হিসাব কোথায়?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সয়াবিন তেলের সংকট বুঝতে হলে শুধু আমদানি কত হয়েছে, সেই হিসাব দেখলেই হবে না। আমদানির পর পরিশোধনাগার থেকে কত তেল বের হচ্ছে, কোন কোম্পানি কতটা বাজারে ছাড়ছে, ডিলাররা কতটা পাচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা দোকানে কতটা পৌঁছাচ্ছে— পুরো চেইনটি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ আমদানি পর্যায়ে পর্যাপ্ত তেল থাকলেও মাঝপথে সরবরাহ কমে গেলে খুচরা বাজারে সংকট তৈরি হতে পারে। আবার বাজারে পণ্য থাকলেও কোনো পর্যায়ে মজুত করে রাখলে কৃত্রিম সংকট দেখা দিতে পারে। এ কারণেই ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাজার তদারকির ক্ষেত্রে শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না। আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ডিলার এবং পাইকারি পর্যায়েও নজরদারি দরকার।

মজুতদারির পুরোনো অভিযোগ

সয়াবিন তেলের বাজারে মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলেও বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যে চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল জব্দ এবং প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনায় বাজারে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—সরবরাহ কমলেই কি বাজারে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়? আর দাম সমন্বয়ের পরই কি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাড়ছে সংসারের খরচ

সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়। তেলের দাম বাড়লে হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, ভাজাপোড়ার দোকানসহ তেলনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত খাবারের দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে চাল, ডাল, ডিম, মুরগি, মাছ ও সবজির বাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ সয়াবিন তেলের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। একজন সাধারণ ক্রেতার জন্য হিসাবটি সরল— লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়লে মাসে কয়েক লিটার তেল কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় খুব বেশি মনে না হলেও সব নিত্যপণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়লে মোট বাজার খরচে তার প্রভাব বড় হয়ে দাঁড়ায়।

সংকট কাটাতে কী প্রয়োজন?

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে সরবরাহ স্বাভাবিক করা। দাম নির্ধারণের পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত তেল আছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। প্রয়োজনে আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতিদিনের সরবরাহের তথ্য নেওয়া যেতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠান কত তেল আমদানি করেছে, কতটা পরিশোধন করেছে এবং কতটা বাজারে ছেড়েছে— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে সংকটের প্রকৃত জায়গা শনাক্ত করা সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোও জরুরি। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর ভোজ্যতেলের বাজার বেশি নির্ভরশীল হলে সরবরাহে কোনো সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সয়াবিন তেলের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু দাম বাড়ার গল্প নয়; এটি সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা এবং বাজার তদারকিরও পরীক্ষা। সরকার বলছে দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে ক্রেতারা বলছেন, প্রয়োজনের সময় দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারাও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। এই তিনটি বক্তব্যের মধ্যকার ফারাকই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দাম ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা করা হয়েছে। এখন ভোক্তার প্রত্যাশা খুব সরল— নির্ধারিত ২০৪ টাকায় যেন দোকানে তেল পাওয়া যায়। দাম বাড়ানোর পরও যদি পণ্য না মেলে, তাহলে ভোক্তার কাছে সেটি নিছক মূল্যবৃদ্ধি নয়, সরবরাহ সংকটও। আর সেই সংকট যদি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শুধু বাজার তদারকি নয়, পুরো ভোজ্যতেল সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত