ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হাম মোকাবিলায় মাসব্যাপী বিশেষ কার্যক্রম

হাম মোকাবিলায় মাসব্যাপী বিশেষ কার্যক্রম

দেশে হাম-রুবেলা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদান কার্যক্রম থেকে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষায় মাসব্যাপী বিশেষ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে এ কার্যক্রম চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। 'ইনটেনসিফাইড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন' নামের এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী যেসব শিশু চলমান হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে টিকা পায়নি বা কোনো কারণে বাদ পড়েছে, তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে এর মধ্যে ছয় মাস বয়সে পৌঁছানো এবং হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের টিকা গ্রহণের উপযুক্ত নতুন শিশুদেরও টিকা দেওয়া হবে।

গতকাল রোববার বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাসব্যাপী এ বিশেষ কার্যক্রমের ঘোষণা দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, হাম-রুবেলা থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের অংশ হিসেবেই বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছর দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত এপ্রিল থেকে পর্যায়ক্রমে হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার শিশু এই টিকা পেয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের সাম্প্রতিক তথ্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এখনও কিছু শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাদ পড়াদের খুঁজতে বাড়ি বাড়ি অভিযান : সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ক্যাম্পেইনে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের হিসাব থেকে বাদ পড়া শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা সব সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে যেসব শিশু আগের তালিকায় ছিল না, নতুন করে নির্ধারিত বয়সসীমায় এসেছে অথবা কোনো কারণে ক্যাম্পেইনের সময় টিকা নিতে পারেনি, তাদের একটি অংশ তালিকার বাইরে থেকে যেতে পারে। এ কারণে এবার শুধু আগের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের তালিকা বা লক্ষ্যমাত্রার ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎসের তথ্য মিলিয়ে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ কার্যক্রমের সময় স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা গ্রহণের অবস্থা যাচাই করবেন। যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা বাদ পড়েছে, তাদের তালিকাভুক্ত করে দ্রুত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একই বয়সসীমার শিশুদের নিয়ে পরিচালিত ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি ছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এই পার্থক্য থেকে ধারণা করা যায়, হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের বিদ্যমান তালিকা বা লক্ষ্যমাত্রার বাইরে কিছু শিশু থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিশেষ কার্যক্রমে প্রকৃত বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের তথ্য, হাম-রুবেলা টিকাদান রেজিস্টার, স্থানীয় মাইক্রোপ্ল্যান, আগের ক্যাম্পেইনের তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের মনিটরিংয়ের ফলাফল সমন্বয় করে দেখা হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাইয়ের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ টিকা নেয়নি : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছরের হাম পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে আক্রান্ত শিশুদের টিকাগ্রহণের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে শনাক্ত হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামের টিকা গ্রহণ করেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এই তথ্য টিকাদান কার্যক্রমে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। হাম-রুবেলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু নতুন করে টিকা দেওয়াই নয়, যেসব শিশু আগের কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে তাদেরও খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ পরিচালিত 'র‍্যাপিড কনভিনিয়েন্স মনিটরিং'-এর তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও এ উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করছে, প্রচলিত টিকাদান কাঠামোর পাশাপাশি বিশেষভাবে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

নিয়মিত টিকাদানও জোরদার : হাম মোকাবিলায় সরকার শুধু বিশেষ ক্যাচ-আপ কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, রোগ নজরদারি বাড়ানো এবং হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সরকার এরই মধ্যে 'হাম-রুবেলা ক্লিনিকাল কেইস ম্যানেজমেন্ট জাতীয় নীতিমালা' প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালার আলোকে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং রোগ ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। ফলে কোনো এলাকায় টিকাদানের আওতা কম থাকলে সেখানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের একটি অংশ টিকার বাইরে থাকলে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই টিকাদানের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কোনো শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে কি না, সেটিও নিয়মিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শুধু আগের তালিকা নয়, নতুন শিশুও আসবে : এবারের বিশেষ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— আগের ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া শিশুদের পাশাপাশি এর মধ্যে ৬ মাস বয়সে পৌঁছানো নতুন শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হবে। ফলে কার্যক্রমটি শুধু আগের ক্যাম্পেইনের ঘাটতি পূরণে সীমাবদ্ধ থাকছে না; নতুন করে টিকার উপযুক্ত হওয়া শিশুদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো এলাকায় আগের ক্যাম্পেইনের সময় একটি শিশু বয়সসীমার কারণে টিকা নেওয়ার তালিকায় না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হতে পারে। আবার কোনো পরিবার স্থানান্তরিত হওয়া, তথ্যের ঘাটতি বা অন্য কোনো কারণে আগের তালিকায় না-ও থাকতে পারে। এ ধরনের শিশুদেরও এবার শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। এ জন্য মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শিশু টিকা নিয়েছে কি না, নিলে কখন নিয়েছে এবং টিকার কোনো ডোজ বাদ পড়েছে কি না— এসব তথ্য যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

'কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে' : স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য, হাম-রুবেলা টিকার জন্য উপযুক্ত কোনো শিশুই যেন বাদ না পড়ে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশেষ কার্যক্রমে আগের ক্যাম্পেইনের অর্জনের হারকে চূড়ান্ত বিবেচনা না করে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ক্যাম্পেইনের সফলতা শুধু কতসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, সেই হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। টিকার উপযুক্ত শিশুদের মধ্যে কেউ বাদ পড়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে এবার বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে সম্ভাব্য বাদ পড়া শিশু শনাক্তের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় স্থানীয় পর্যায়ে আগের মাইক্রোপ্ল্যান, টিকাদান রেজিস্টার, ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখা হবে। এরপর যেসব এলাকায় টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সম্ভাবনা বেশি, সেসব এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করা হবে।

এক মাসের কর্মসূচিতে জোর নজরদারি : আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই বিশেষ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের ওপর নজরদারিও থাকবে। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশু শনাক্তের পাশাপাশি টিকা দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাম-রুবেলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের আওতা আরও বাড়ানো এবং টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হাসপাতালে শনাক্ত হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়া শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

সরকারের নেওয়া মাসব্যাপী বিশেষ কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো— আগের ক্যাম্পেইনের তালিকা বা লক্ষ্যমাত্রার বাইরে থাকা শিশুদেরও শনাক্ত করা এবং তাদের টিকার আওতায় আনা। এর মাধ্যমে হাম-রুবেলার বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা আরও জোরদার করার পাশাপাশি দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের সামগ্রিক আওতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো শিশুই যেন টিকা থেকে বাদ না পড়ে— এই লক্ষ্যেই এবার মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই ও বাড়ি বাড়ি অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ কার্যক্রম শেষে বাদ পড়া শিশুদের কতটা টিকার আওতায় আনা গেল, সেটিও পরবর্তী সময়ে মূল্যায়ন করা হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত