
ঢাকা ও আশপাশের এলাকার যানজট নিরসনে সাবওয়ে, ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন এবং পণ্য পরিবহন সহজ করতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকা ও দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোর যানজট কমবে এবং দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের 'সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসসদীয় স্থায়ী কমিটির' প্রথম বৈঠকের কার্যপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে স্থায়ী কমিটির কক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে তার মধ্যে কিছু প্রকল্পের অগ্রগতি কার্যপত্রে তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো- ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পায়রা নদীর ওপর সেতু, পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত দোতলা সড়ক এবং মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কে মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ।
রাজধানীর যানজট নিরসনে ১২টি রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে, ৩৯ দশমিক ২৪ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ৮৮ কিলোমিটার ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সাবওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হলেও নির্মাণকাজ শুরুর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রিং রোডের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও শেষ হয়েছে, এর প্রায় ২৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার অংশ উড়ালসড়ক হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতলা রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর ও ইপিজেড-সংলগ্ন শিল্প এলাকার যানজট নিরসন এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে ইপিজেড পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ এবং নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সার্ভিস লেন ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হলে সাভার ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ৪৪ কিলোমিটার নতুন এলিভেটেড সড়ক তৈরি হবে। এর ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যানবাহন ঢাকা শহর অতিক্রম না করেই দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যেতে পারবে। এতে রাজধানীর যানজট অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্প হিসেবে পরিচিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৮ হাজার ৯৪০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। র্যাম্পসহ প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার এবং র্যাম্পের দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার।
প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ধাপের ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপের ৮৬ দশমিক ০২ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপের ২১ দশমিক ৩১ শতাংশ ভৌত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ইতোমধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দক্ষিণে কাওলা থেকে ফার্মগেট ও হাতিরঝিল পর্যন্ত র্যাম্পসহ মোট ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে ঢাকা শহরে মোট ৪৭ কিলোমিটার নতুন সড়ক যুক্ত হবে বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের ব্যয় নির্বাহে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে 'সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রজেক্ট' শীর্ষক একটি সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও দ্থোতলা রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ১০ দশমিক ৮১ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ এবং ৯ দশমিক ০৬ কিলোমিটার দোতলা রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। দোতলা রাস্তাটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যানবাহনকে রাজধানীতে প্রবেশ করতে হবে না। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলমুখী যানবাহন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচল করতে পারবে। এতে যানজট ও জনদুর্ভোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৩৯ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে, পরিকল্পনায় রিং রোড : ঢাকার যানজট কমাতে ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বালিয়াপুর থেকে নিমতলী, কেরানীগঞ্জ, ফতুল্লা ও বন্দর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত ৩৯ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার যানজট কমানোর পাশাপাশি জাতীয় মহাসড়ক এন-৫, এন-৮ ও এন-১-এর সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ স্থাপন হবে।
এদিকে, ঢাকা এলিভেটেড ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২৪ সালে সম্পন্ন হয়েছে। প্রস্তাবিত রিং রোডের মোট দৈর্ঘ্য ৮৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ২৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এলিভেটেড অংশ বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন এবং যাত্রাবাড়ী-পোস্তগোলা এলাকায় যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব হবে। তবে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।
ঢাকায় ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ের পরিকল্পনা : রাজধানীর গণপরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকা শহরে সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। সমীক্ষায় ১২টি রুটে মোট ২৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রুট 'ও'-এর দৈর্ঘ্য ৩৪ দশমিক ৯২ কিলোমিটার। টঙ্গী থেকে মহাখালী ও সদরঘাট হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত বিস্তৃত এ রুটে ২৪টি স্টেশন রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে, রুট 'বি'-এর দৈর্ঘ্য ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। গাবতলী থেকে বিসিএসএওএইচএস-ঢেলনা পর্যন্ত এ রুটে ১৪টি স্টেশন রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হলে সাভার ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ৪৪ কিলোমিটার নিরবচ্ছিন্ন উড়ালসড়ক তৈরি হবে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে ৩০৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হয়েছে। তবে সাবওয়ে নির্মাণের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর সেতুর পাশে দুই লেনের দ্বিতীয় একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশন নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। চীনের শতভাগ অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের অনুরোধ জানিয়ে ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সেতু বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণে ব্যয় ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা : দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার কচুয়া-বেতাগী সড়কে পায়রা নদীর ওপর ১ হাজার ৬৯০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ ছাড়া মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কে মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ওপর ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ১৭৪ কোটি ৬৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৬৬০ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) ঋণ ৩ হাজার ৫১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। প্রকল্পটির আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগের জন্য দরপত্র কার্যক্রম চলছে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেতুটি নির্মিত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে বিকল্প সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কমবে এবং যাতায়াতের দূরত্ব, সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে।
মেঘনা নদীতে আরও সেতু, বিকল্প যোগাযোগের পরিকল্পনা : ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওপর চাপ কমাতে মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কে মেঘনা নদীর ওপর প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু এবং ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর সড়কে ৩ দশমিক ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ।
শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আলোকে অনুষ্ঠিত সপ্তম ও অষ্টম প্ল্যাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এ জন্য প্রকল্প ডেলিভারি টিমও গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর সড়কে মেঘনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২০ সালে সম্পন্ন হয়। প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশনন্দী-কড়ইকান্দি ফেরিঘাট এলাকায় প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মাণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কার্যপত্রে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর উল্লেখ করা হয়েছে। সেতুটি নির্মিত হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগরের সঙ্গে ঢাকা ও অন্যান্য জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। একই সঙ্গে এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিকল্প যোগাযোগপথ হিসেবে কাজ করবে।
বরিশাল-ভোলা সেতু : দ্বীপ জেলা ভোলার সঙ্গে বরিশালের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন এবং গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণের এই প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে আগে করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রকল্পের আওতায় পুনরায় যাচাই করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আলোকে অনুষ্ঠিত সপ্তম ও অষ্টম প্ল্যাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়।
২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় প্রকল্পটি পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প ডেলিভারি টিমও গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে বরিশাল-রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ-ভোলা রুটে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কার্যপত্র অনুযায়ী, যমুনা সেতু চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টোল বাবদ ১০ হাজার ২৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
যমুনা সেতুতে টোল আদায় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে যমুনা সেতু, মুক্তারপুর সেতু, পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেল। এসব অবকাঠামো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন এবং পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যমুনা নদীর ওপর নির্মিত ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৯৮ সালের জুনে কাজ শেষ হয়। একই বছরের ২৩ জুন সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
সেতুটিতে সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অপটিক্যাল ফাইবার টেলিফোন লাইন স্থাপন করা হয়েছে। কার্যপত্র অনুযায়ী, সেতুটি চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টোল বাবদ ১০ হাজার ২৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সেতু নির্মাণে নেওয়া ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৫১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
পদ্মা সেতুতে টোল আদায় ৩ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা : দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে নির্মিত পদ্মা সেতু ২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টোল বাবদ ৩ হাজার ৫৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। সেতু নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণের বিপরীতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৫১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ১ দশমিক ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমবে।
কর্ণফুলী টানেলে টোল আদায় ১১৬ কোটি টাকা : কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক টানেলটি ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সড়ক টানেল হিসেবে উল্লেখ করা এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ২৫৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানেলটি থেকে টোল বাবদ ১১৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের পশ্চিম অংশের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব অংশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করেছে। সেতু বিভাগের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, টানেলটি চালু হওয়ার পর চট্টগ্রাম শহরে যান চলাচল নির্বিঘ্ন হয়েছে, চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ আরও উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে সারা দেশে ৭৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০৫০ সাল নাগাদ ৫৭টি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তালিকায় নতুন সেতু, টানেল ও বিকল্প যোগাযোগপথ নির্মাণের পাশাপাশি কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেলে সেতু বা টানেল নির্মাণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
২০৫০ সাল পর্যন্ত ৫৭ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা : বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের জন্য প্রণীত ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে সারা দেশে মোট ৭৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫০ সাল নাগাদ বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের সংখ্যা ৫৭টি। সমন্বিত ও নিরবচ্ছিন্ন পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দেশের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চিহ্নিত করে সেগুলো গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় একটি প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা, পাঁচটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পর্যালোচনা এবং চারটি প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী, পিরোজপুরের কঁচা ও সন্ধ্যা নদী, সাতক্ষীরার গলঘেসিয়া ও খোলপেটুয়া নদীর মোহনা, খুলনার ভৈরব নদ, বরগুনার বিষখালী নদী, পটুয়াখালী-আমতলী-বরগুনা সড়কের পায়রা নদী এবং বাকেরগঞ্জ-বাউফল সড়কের কারখানা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য প্রকল্প তালিকায় রয়েছে। কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেলের ওপর সেতু বা টানেল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সেতু ও টানেল এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ, বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা : অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। কার্যপত্রে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু সার্ভিস এলাকায় ৬ দশমিক ০৩ মেগাওয়াট এবং সেতু ভবনের ছাদে ২৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল এলাকায় প্রায় ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। পাশাপাশি সেতু ভবন প্রাঙ্গণে ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির আলোকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সাইট অফিস ও প্রকল্প এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮২০টি গাছ রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কার্যপত্রে ইতোমধ্যে ২৩ হাজার ৭৭৪৭টি গাছ রোপণের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।