ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বৈধ ব্যবসা যখন হারাম

হুমাইদুল্লাহ তাকরিম
বৈধ ব্যবসা যখন হারাম

আল্লাহতায়ালা মানব জাতির জন্য যখন কোনো কিছু হালাল করেছেন, তখন তা ব্যাপকার্থে ব্যবহার করেছেন। আর যখন কোনো কিছু হারাম করেছেন, তখন একটা-একটা নাম ধরে নির্দিষ্ট করে হারাম করেছেন। আর যখন আল্লাহতায়ালা কোনো একটা হারাম করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে এর বিকল্প অন্য কিছু করেছেন। উদাহরণস্বরূপ- জিনা বা ব্যভিচার করা হারাম। এর বিকল্পে বিয়ে হালাল ইত্যাদি। অনুরূপভাবে আল্লাহতায়ালা সুদ হারাম করেছেন। এর বিকল্পে ব্যবসা করেছেন হালাল। আল্লাহতায়ালা যা হালাল সাব্যস্ত করেন, কারো সাধ্য নেই তা হারাম করার। আর যা হারাম করেছেন, কারো সাধ্য নেই তা হালাল করার।

অতএব, মানুষ ব্যবসা করতে গিয়ে যদি তাতে হারামের মিশ্রণ ঘটায়, তাহলে ব্যবসা হালাল হলেও তা হারামে রূপ নেয়। যে ব্যক্তি এমনটা করবে, আল্লাহতায়ালা তার জন্য জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এর কারণ হলো, তারা বলে- ব্যবসা সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হলো, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর অধীনে। যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।’ (সুরা বাকারা : ২৭৫)।

ব্যবসা-বাণিজ্যে সচেতনতা ও সতর্কতা : বর্তমানে ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ভেজাল সংযুক্তকরণ, প্রতারণা ও মিথ্যা শপথের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসার প্রতিটি সেক্টরে সাধারণ বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হারামের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নাপাক অর্থ উপার্জনে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি তৎপর। তারা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবসায় লিপ্ত আছেন। সারাদিন পরিশ্রম করেন অর্থের তাগিদে। পরিশ্রমটা যদি বিফলে যায়, তাহলে এর মূল্য কী আছে? হালাল উপার্জনের তাগিদে ব্যবসায় লিপ্ত আছেন এবং পরিশ্রম শেষে অর্থ ও খাদ্য নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু পরিশ্রমের টাকা হারাম উপায়ে অর্জিত হওয়ার ফলে সম্পূর্ণ অর্থ ও খাদ্যগুলো কোনো হালাল কাজের পরিচয় বহন না করে হারাম হয়। পরকালে যখন উপস্থিত হবেন, তখন দেখবেন, সব উপার্জনই ছিল হারাম। যে উপার্জন ছিল পরিশ্রমের কষ্টিপাথরে গড়া, তা আমলনামার খাতায় সওয়াবের পরিবর্তে হারাম লেখার মুহূর্ত বড়ই বিষাদের হবে সেদিন। আর ওই মুহূর্তে দুঃখ এবং আফসোস করেও কোনো কাজে আসবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে, সে কোত্থেকে সম্পদ উপার্জন করল, হালালভাবে নাকি হারাম উপায়ে!’ (বোখারি : ২০৫৯)। তাই ইসলাম আমাদের এ সম্পর্কে কী তথ্য পরিবেশন করেছে ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাদের কোন কোন বিষয়ের প্রতি সঠিক জ্ঞান রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমল করার ফলাফল জানার চেষ্টা করি।

হালাল ব্যবসা যখন হারাম : কয়েকটি কারণে হালাল ব্যবসা হারাম হয়। যেমন-

প্রথম কারণ- মাপে কম দেওয়া : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মন্দ পরিণাম তাদের, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরো মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে অথবা ওজন করে, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন : ১-৩)। এ আয়েতের শিক্ষা হলো, ওজনে কম না দেওয়া। এ আয়াতে হুঁশিয়ারির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা আমাদের সতর্ক করেছেন, যেন আমরা মাপে কম না দিই। যখন ব্যবসায়ীগণ নিজেরা পণ্য ক্রয় করেন, তখন পূর্ণমাত্রায় তা ওজন করে নেন। কিন্তু অন্যের কাছে বিক্রির সময় ওজন কমিয়ে দেন। এটা চরম প্রতারণা এবং হক নষ্ট করার শামিল। বর্তমানে এ রোগ এত বেশি প্রচলিত, যার থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আপনি যখন কোনো ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করেন, তখন ওজনের সময় একটি চালের দানা পরিমাণও যদি কম দেন, তা আপনার ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত হক থেকে যাবে, যতক্ষণ না তাকে তার হক পূর্ণ করে দেন কিংবা সে আপনাকে ক্ষমা করে দেন। অন্যথায় কেয়ামতের দিন তার হক পরিশোধ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তা কখনও পণ্যের মাধ্যমে হবে না, বরং আপনার আমলের বিনিময়ে পরিশোধ করা হবে। কেননা, সেখানে কোনো পণ্যের অস্তিত্ব থাকবে না। ওজনে কম দেওয়া এবং ঠকানোর মাধ্যমে একজন ক্রেতার হক নষ্ট করা হয়; যা তার অধিকার। ক্রয়কৃত প্রতিটি দানা ক্রেতার সম্পদ। একটা দানার মাধ্যমেও প্রতারণা করা হলে তা অবশ্যই তার সম্পদ নষ্ট করা হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা : ২৯)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ন্যায়পন্থা, অনুগ্রহ ও নিকটাত্মীয়দের হক প্রদানের নির্দেশ দেন এবং অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কার্যাবলি থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা নাহল : ৯০)।

দ্বিতীয় কারণ- জুলুম করা : কিছু ব্যবসায়ী ক্রেতার ওপর জুলুম করে থাকেন। অর্থাৎ একটা পণ্য ১০০ টাকায় ক্রয় করে তা বহুগুণ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেন। নিশ্চিত একজন ক্রেতার ওপর এটা বড় জুলুম। জুলুমের হাজার প্রকার-পদ্ধতি থাকতে পারে। মানুষ ভিন্ন ভিন্ন জুলুমের শিকার হতে পারে। কিন্তু জুলুম শুধু জুলুমই হয়ে থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জালেমরা কখনও সফলকাম হয় না।’ (সুরা আনআম : ৫৭)। তিনি আরও বলেন, ‘অচিরেই জালেমরা জানতে পারবে, তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল কোথায় হবে!’ (সুরা শুআরা : ২২৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার জন্য জুলুম হারাম করেছি আর জুলুম তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (মুসলিম : ৬৭৩৭)।

তৃতীয় কারণ- প্রতারণা করা : পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে পণ্য বিক্রি করা জঘন্যতর প্রতারণা। বিশেষত, এ প্রতারণা করার টেকনিক হলো- ১০টা ভালোর মধ্যে ১-২টা ত্রুটিযুক্ত পণ্য চালিয়ে দেওয়া; যা সাধারণত আলাদা করে বিক্রি করা সম্ভব নয়। এ ধরনের প্রতারণাও নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে (বরং গোপন করে) বিক্রি করে, সে সর্বদা আল্লাহর ক্রোধে থাকে এবং ফেরেশতারা সব সময় তাকে অভিশাপ করতে থাকে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪৭)। এছাড়া পণ্যের ত্রুটি গোপন করার মধ্য দিয়েও ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত কমে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা যতক্ষণ পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হয়, ততক্ষণ তাদের ইচ্ছাধিকার থাকবে (ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করা বা বাতিল করা)। যদি তারা সত্য বলে এবং অবস্থা ব্যক্ত করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত মুছে ফেলা হয়।’ (বোখারি : ২০৭৯)।

চতুর্থ কারণ- মিথ্যা শপথ করা : ইসলামে মিথ্যা শপথ গ্রহণের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা নিষিদ্ধ। কাপড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ জুয়া-চুরি বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে, রমজান মাস এলে বাংলাদেশে এর মাত্রা আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। ঈদের কেনাকাটা অত্যধিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে, তারা এর সুযোগ ব্যবহার করে বেশি অর্থ আয়ের জন্য অসৎ পথ অবলম্বন করে থাকেন।

ভিন্ন ভিন্ন কথার কারিশমা দিয়ে বলেন, ভাই! আমার এ কাপড়টির ক্রয়মূল্য এত টাকা, আপনাকে এত টাকা দিতে হবে; নইলে আমাদের লোকসান হবে। অথবা বলেন, আপনাকে একেবারে কেনা দরে দিয়ে দিচ্ছি ইত্যাদি। মিথ্যা মানবতাবোধকে লোপ করে, নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটায়। মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ। মিথ্যা বলে বা মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো, যে তার ব্যবসায়িক পণ্যকে মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।’ (মুসলিম : ১০৬)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত