
কোভিডের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতেই সারা দুনিয়ায় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যার প্রভাবে বাংলাদেশের মতো অতি আমদানিনির্ভর দেশগুলো পড়েছে চরম বিপাকে। গেল কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে দেশের বাজারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জুন থেকেই এলসি খোলার পরিমাণ কমতে থাকে। গত জুনে ৮৩৭ কোটি ৭৫ লাখ ৭৭ হাজার ২১৭ ডলারের এলসি খোলা হয়। যা জুলাই মাসেই দাঁড়ায় ৬২২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭১ ডলারে। আগস্টে তা আরও কমে ৫৬৪ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ডলারে নেমে আসে। সুতরাং বিদায়ী মাসে এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ৫৭ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩২ ডলার। গেল (আগস্ট) মাসে ২০৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিটেন্স এসেছে। দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ৯৫ টাকা ধরে) যার পরিমাণ ১৯ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। তবে এটি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে ৭ কোটি ডলার কম।
বৈধ পথ রেখে হুন্ডির পেছনে কেন : হিসাব বলছে, মোট রেমিট্যান্সের ৪৯ শতাংশ আসে এখনও হুন্ডির মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন আসে, কেন সবাই বৈধ পথ রেখে ছোটে হুন্ডির পেছনে? বাংলাদেশের মোট প্রবাসীদের প্রায় অর্ধেকের বেশি থাকে মধ্যপ্রাচ্যে। হুন্ডিতে টাকা পাঠানোর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, অবৈধ অভিবাসীদের টাকা পাঠানোর প্রতিবন্ধকতা। অধিকাংশ প্রবাসীদের বৈধ কাগজপত্র নেই। ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ও বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করা প্রবাসী এবং দেশে বাস করা তাদের পরিবার-পরিজনদের জন্য বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা সময়সাপেক্ষ এবং প্রতিকূল। এ ছাড়া টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংকে বৈধ আয় উল্লেখ করতে হয়। তাই অতিরিক্ত টাকা পাঠানোর সুযোগ থাকে না। ব্যাংক কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়েও আছে প্রশ্ন। বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহারও তাদের নানাভাবে নিরুৎসাহিত করে। আবার ব্যাংকের ক্ষেত্রে এক থেকে দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জ কাটা হয়। কিন্তু হুন্ডিতে বাকিতেও (লোন) টাকা পাঠানো যায়। ব্যাংকিং চ্যানেল দ্বারা নগদ প্রেরণ এবং নগদ গ্রহণ অনেকটা সময়সাপেক্ষ যেখানে, হুন্ডিতে টাকা পাওয়া যায় মাত্র ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে। এ ছাড়া হুন্ডি বন্ধে সরকারের মাত্র আড়াই শতাংশ (২.৫) প্রণোদনা রয়েছে।
ব্যাংকের তুলনায় হুন্ডির রেট যেমন : ব্যাংক থেকে হুন্ডির রেট বেশি (বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ডলারের দর ৯৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে বেসরকারি বেশ কয়েকটি ব্যাংক বলছে, তারা ৯৭ টাকায়ও ডলার কিনছে। এর সঙ্গে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা যোগ হবে। অর্থাৎ ১০০০ ডলার পাঠালে পাবেন ৯৯ হাজার ৪২৫ টাকা। তবে এখান থেকে প্রতিষ্ঠানভেদে এক থেকে দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জ কেটে নেওয়া হয়। এ হিসেবে চার্জ বাদ দিয়ে ১০০০ ডলারের বিপরীতে একজন প্রবাসী পাবেন ৯৭ হাজার ৪৮৫ টাকা। অথচ হুন্ডিতে ডলারের রেট ধরা হয়েছে ১০৮ টাকা। অর্থাৎ ১০০০ ডলারের বিপরীতে ওই প্রবাসী পাবেন ১ লাখ ৮ হাজার টাকা। তিনি ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে বেশি পাচ্ছেন ১০ হাজার ৫১৫ টাকা)। ফলে প্রবাসীরা অবৈধ জেনেও বেশি লাভের আশায় হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন।
হুন্ডি সমস্যা সমাধানে সম্ভাব্য উপায় : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে ২০২১ সালে সবকিছু বন্ধ ছিল। তখন হুন্ডির প্রভাব কমে যায়। বৈধ চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে রেমিটেন্স প্রবাহও বেড়ে যায়। এখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়েছে। ভ্রমণ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি এসেছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকে ডলারের রেট ও কার্ব মার্কেটের (খোলাবাজার) রেটের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। মানুষও হুন্ডির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কমছে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ। এমন অবস্থাতে সঠিক পদক্ষেপ হলো, সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বৈধ এবং অবৈধ চ্যানেলের রেটের পার্থক্য কমিয়ে এনে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি করা এবং সহজ শর্তে ব্যাংকিং সেবা ও মানি ট্রান্সফার নিশ্চিত করা।
সমস্যা সমাধানে প্রবাসীদের ধারণা : সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে প্রবাসীরা বলছেন, সরকারি প্রণোদনার হার ২.৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নতিকরণ, পর্যাপ্ত বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলসেবা নিশ্চিতকরণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যাংকিং জটিলতা নিরসন ও ব্যাংকিং কাগজি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, টাকা উত্তোলনে অহেতুক প্রশ্ন পরিহার, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলোকে সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়ানো, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত মনিটরিং ইত্যাদি।
হুন্ডির বদলে অফিসিয়াল চ্যানেল : হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে আসে। বিষয়টি স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি এক কর্মশালায় উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, 'সাম্প্রতিক সময়ের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী অফিসিয়াল চ্যানেলে এসেছে ৫১ শতাংশ টাকা। হুন্ডিতে এসেছে ৪৯ শতাংশ।' তিনি প্রবাসীদের প্রতি হুন্ডির মাধ্যমে টাকা না পাঠিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে অনুরোধ করেন। বলেন, 'হুন্ডিতে টাকা পাঠানো নিরুৎসাহিত করতে আমরা অফিসিয়াল চ্যানেলে টাকা দেশে আনার সুফল সবাইকে জানাচ্ছি।'
লেখক : শিক্ষার্থী, ইএমবিএ, ফাইন্যান্স
অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা