ঢাকা শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষা ও মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ

এম ইমরান হুসাইন
শিক্ষা ও মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার কাতারে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন মাওলানা হাফেজ আহমদ ইসলামাবাদী। আন্দোলনের সূচনা থেকেই তিনি ঢাকার শাহবাগ, বিজয়নগর পানির ট্যাংকি, পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলার মোড়, জাতীয় প্রেসক্লাব, বায়তুল মোকাররম, ফকিরাপুল, মানিকনগর বিশ্বরোড, শাপলা চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন।

২০২৪ সালের ২ আগস্ট জুমার দিন জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে অনুষ্ঠিত মিছিলে সামনের সারিতে থেকে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ পুলিশের বুলেট, গ্রেপ্তার, রিমান্ডের ভয়, মামলা, হামলা, নির্যাতনের শঙ্কা তাকে রাজপথ থেকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলো তার ও তার পরিবারের জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। ছাত্র-জনতার পক্ষে লেখালেখির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার বড় ভাই মুফতি মুহাম্মদ ইসলামাবাদী ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই গ্রেপ্তার হন। এক মাসেরও বেশি সময় পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরিবারের সদস্যরা জানতেন না, তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। পরিবারের এ কঠিন সময়ে বড় ভাইয়ের গ্রেপ্তারের সংবাদও আহমদ ইসলামাবাদীকে রাজপথ থেকে বিন্দুমাত্র সরাতে পারেনি। ২৩ জুলাইয়ের পর নব উদ্যোমে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন রাজপথে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন পর্যন্ত দৃঢ় মনোবল নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যান। অবশেষে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে তার প্রত্যাশা- দেশের মানুষ যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে, অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং লাল-সবুজের প্রতিটি পরতে পরতে ন্যায়-ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার সংগ্রাম অতীতেও ছিল, বর্তমানেও বহাল রয়েছে। জুলাইয়ের আগেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে ফটিকছড়িতে অংশগ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ২০২২ ও ২০২৩ সালে ঢাকার রাজপথে অবৈধ সরকারের পতন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, গ্রেপ্তারকৃত আলেমণ্ডওলামার নিঃশর্ত মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সে সময় বিএনপিসহ ৩৯টি রাজনৈতিক দলের আন্দোলনে বিএনপি জোটের অন্যতম শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও ১২ দলীয় জোটের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জনপদে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

অবৈধ সরকারের পতনের দাবিতে ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর মাতুয়াইলে পুলিশের গুলি, টিয়ারগ্যাসে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সুসংগঠিত করে স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।

মাওলানা ইসলামাবাদী ১৯৯৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব সুয়াবিল ভাঙাদিঘিরপাড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সাহিত্যিক মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী। যিনি বিএনপি জোটের শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি। মাওলানা আহমদ জমিরিয়া হোসাইনিয়া তাবলিগুল কোরআন মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা ও হিফজুল কোরআন সম্পন্ন করেন। পরে নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা থেকে স্নাতকোত্তর এবং হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। ২০২২ সালে রাজধানীর দারুল উলুম নতুনবাগ রামপুরায় উচ্চতর ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগে ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে দাখিল, আলিম ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাযিল (ডিগ্রি) এবং কামিল (মাস্টার্স) অর্জন করেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে তিনি সৌদির মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে কোরআনুল কারিমের হিফজ বিষয়ে বিশেষ সম্মাননা সনদ লাভ করেন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজসেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত। শীতবস্ত্র বিতরণ, পবিত্র রমজানে ইফতার সামগ্রী বিতরণ, অসহায় মানুষের মধ্যে সেলাই মেশিন ও হুইল চেয়ার প্রদান, নলকূপ স্থাপনসহ বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।

বর্তমানে তিনি ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ (বৃহত্তর ফটিকছড়ি)-এর সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক, পূর্ব সুয়াবিল ইসলামি পাঠাগারের সাংগঠনিক সম্পাদক, আন-নছির সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, ফটিকছড়ি জাগ্রত যুব সমাজের উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি ‘মাসিক তাকবীর’ নামক সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষকতা করেছেন ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম নতুনবাগ এবং মারকাজুশ শাইখ আরশাদ আল-মাদানি মাদ্রাসায়। দৈনিক যুগান্তর, আলোকিত বাংলাদেশ, আমার দেশ, ইনকিলাবসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে তার গবেষণামূলক অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

বর্তমানে তিনি সুয়াবিল ভাঙাদিঘিরপাড় তালিমুল ইসলাম মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। সেখানে ইলমুল হাদিস, ইলমুল ফিকহ ও আরবি সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যাপনা করছেন। শিক্ষা, সমাজসেবা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শকে ধারণ করে মানবকল্যাণে আজীবন কাজ করে যাওয়াই তার প্রত্যয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত