ঢাকা শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিচার, সংস্কার ও অঙ্গীকার

বিচার, সংস্কার ও অঙ্গীকার

আরও একটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত হলো। এ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে প্রতিটি হত্যার বিচার করা হবে। একই সঙ্গে শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণ, আহতদের চিকিৎসা এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরার কথাও তিনি বলেছেন। এসব ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এসব প্রতিশ্রুতির প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচারহীনতার কোনো স্থান নেই। দীর্ঘ সময় ধরে গুম, খুন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা রাষ্ট্র ও সমাজকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হলে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে। বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করে না। এটি ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ও পালন করে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত বার্তা দেয় যে, ক্ষমতার অপব্যবহার কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা শুধু বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল আরও বিস্তৃত। মানুষ শুধু একটি সরকারের পতন চায়নি। তারা চেয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতির পরিবর্তন। তারা চেয়েছে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করবে। নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হবে। বিচার বিভাগ নিরপেক্ষ থাকবে। প্রশাসন দায়বদ্ধ থাকবে জনগণের কাছে। মানুষের মৌলিক অধিকার নিরাপদ থাকবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তারা শুধু একটি বিষবৃক্ষের পতন চাননি। তারা চেয়েছেন সেই ভূমিরও আমূল সংস্কার। এ সত্যটি মনে রাখা জরুরি। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে রাষ্ট্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে করতে হবে দলীয় প্রভাবমুক্ত। নিশ্চিত করতে হবে ক্ষমতার ভারসাম্য। নাগরিকের অধিকারকে দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে কোনো দল বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্যের স্থান না করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে সেখানে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। অসম্পূর্ণ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে। একটি জাতীয় স্মৃতি জাদুঘর এমন একটি স্থান হওয়া উচিত, যেখানে ইতিহাস গবেষণার সুযোগ থাকবে। ভিন্নমত ও ভিন্ন অভিজ্ঞতারও যথাযথ স্থান থাকবে। কারণ একটি গণঅভ্যুত্থান বহু মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে। তার ইতিহাসও বহুমাত্রিক। শহিদদের নামে শিক্ষা বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামকরণ একটি সম্মানজনক উদ্যোগ হতে পারে। আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন কর্মসংস্থান, সুশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা। শুধু স্মৃতিচারণের মাধ্যমে দায় এড়ানো যায় না। নিশ্চিত করতে হবে মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ অধ্যায়ের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে বিচার ও সংস্কারকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে। শহিদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে নয়। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে এমন এক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যেখানে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কোনো স্বৈরাচার আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তবেই জুলাইয়ের আত্মত্যাগ অর্থবহ হবে। সুদৃঢ় হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত