ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রোগী দেখার ফজিলত ও সুন্নতগুলো

রোগী দেখার ফজিলত ও সুন্নতগুলো

সুস্থতার মতো অসুস্থতাও আল্লাহর একটি নেয়ামত। তবুও অসুস্থতার নেয়ামত কারও কাছে এলে সে ঘাবড়ে যায়। ভয় ও হতাশা তাকে ঘিরে ধরে। সে সময় তাকে দেখতে যাওয়া, তার খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনে তার সেবাযতœ করা এবং তার রোগমুক্তির জন্য দোয়া করার ফজিলত ও গুরুত্ব অপরিসীম।

আমরা অনেকেই এই আমলটি করি। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাই। তবে অনেকেই এ কাজটি করি রীতিরেওয়াজ পালন কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে। অথচ এরূপ মানসিক চাপ নিয়ে কোনো রোগীকে দেখতে গেলে সওয়াবের আশা করা যায় না। কারণ, সওয়াব পেতে হলে ইখলাস বা আন্তরিকতা জরুরি। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মানসিকতা থাকা আবশ্যক। হাদিস শরিফে এসেছেÑ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন বলবেন, হে বনি আদম! আমি অসুস্থ ছিলাম। তুমি আমাকে দেখতে আসোনি। সে বলবে, হে আমার রব! আমি আপনাকে কীভাবে দেখতে যাব? আপনি তো বিশ্বজাহানের রব! আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি তাকে দেখতে যাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, আমাকে অবশ্যই তার কাছে পেতে।’ (মুসলিম : ২৫৬৯)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে গেলে সে (যতক্ষণ তার কাছে অবস্থান করে ততক্ষণ) যেন জান্নাতের ফল আহরণ করতে থাকে।’ (তিরমিজি : ৯০৯)।

আলী (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, কোনো মুসলমান অপর (অসুস্থ) মুসলমানকে সকালে দেখতে গেলে ৭০ হাজার ফেরেশতা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। যদি সে সন্ধ্যাবেলা তাকে দেখতে যায়, তাহলে ৭০ হাজার ফেরেশতা ভোর পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে এবং জান্নাতে তার জন্য একটি ফলের বাগান তৈরি করা হয়।’ (তিরমিজি : ৯১১)।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি অসুস্থ রোগীকে দেখতে গেলে আকাশ থেকে একজন আহ্বানকারী তাকে ডেকে বলে, তুমি উত্তম কাজ করেছ, তোমার পথচলা কল্যাণকর হোক এবং তুমি জান্নাতে একটি বাসস্থান নির্ধারণ করে নিয়েছ।’ (ইবনে মাজাহ : ১৪৪৩)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিক হাদিসে রোগী দেখা ও সেবার বিষয়ে শুধু জোর তাগিদই দেননি, নিজের জীবনেও তিনি তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে গেছেন। অমুসলিমরা অসুস্থ হলেও দয়ার নবী (সা.) তাদের দেখতে যেতেন, তাদের সেবা-যতœ করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি গোলাম নবী করিম (সা.) এর খেদমত করত। একবার সে অসুস্থ হলো। মহানবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার মাথার দিকে বসলেন এবং তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো! তখন সে তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা বললেন, তুমি আবুল কাসেমের অনুসরণ করো। ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা.) এই বলে বের হলেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (বোখারি : ১২৫৬)।

অসুস্থ ব্যক্তির কাছে দোয়া চাওয়া

অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়। অতএব, তাকে দেখতে গিয়ে বলা উচিত, আমাদের জন্য দোয়া করুন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে বলেছেন, তুমি কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তাকে তোমার জন্য দোয়া করার অনুরোধ করবে। কেননা, তার দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতোই। (ইবনে মাজাহ : ১৪৪১)।

রোগী দেখার সুন্নত পদ্ধতি

রোগী দেখতে যাওয়ার কিছু সুন্নত পদ্ধতি রয়েছে :

১. অজু সহকারে যাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে যায় তাকে জাহান্নাম থেকে ষাট বছরের পথ দূরে রাখা হবে।’ (আবু দাউদ : ৩০৯৭)।

২. রোগীর অবস্থা বুঝে শরীরে হাত রেখে রোগের কথা জিজ্ঞাসা করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শুশ্রষার পূর্ণতা হলো রোগীর কপালে বা শরীরে হাত রেখে জিজ্ঞেস করা, কেমন আছেন?’ (তিরমিজি : ৪/৩৩৪)।

সেই সঙ্গে এই কথাও বলা লা-বা’সা তুহু-রুন ইনশাআল্লাহ। অর্থাৎ ভয় নেই, আল্লাহর মেহেরবানিতে আরোগ্য লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ। (বোখারি : ৫৬৬২)।

৩. রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, রোগী দেখার সময় হলো উটের দুধ দোহন পরিমাণ। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রোগী দেখার উত্তম পন্থা হলো তাড়াতাড়ি ফিরে আসা।

৪. রোগী কিছু খেতে চাইলে এবং তা তার জন্য ক্ষতিকর না হলে খেতে দেওয়া। রাসুল (সা.) বলেছেন, রোগী যদি কিছু খেতে চায় তবে তাকে খেতে দেওয়া উচিত। (বোখারি : ১০/১১৮)।

৫. রোগীর সামনে উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সুন্নত হলো রোগীর পাশে কম সময় বসা এবং উঁচু আওয়াজে কথা না বলা।

৬. রোগীর জন্য দোয়া করা। বিভিন্ন দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, কোনো রোগীর কাছে গিয়ে নিম্নের দোয়াটি সাতবার পাঠ করলে মৃত্যুরোগ ছাড়া সব রোগ থেকে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। দোয়াটি হলোÑ ‘আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আই ইয়াশফিয়াকা।’ (আবু দাউদ : ৩১০৬)।

সংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন

রাসুলুল্লাহ (সা.) সংক্রামক ব্যাধি তথা মহামারি সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেনÑ ‘কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেও না।’ (তিরমিজি : ১০৬৫)।

সহিহ বোখারির এক বর্ণনায় এসেছে, সিরিয়ায় মহামারি দেখা দিলে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর স্থগিত করে দেন। (বোখারি : ৫৭২৯)।

লেখক : মুহাদ্দিস, দারুল উলুম গোয়ালদী

সোনারাগাঁও, নারায়ণগঞ্জ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত