ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হারানো গৌরব

কালেমা খচিত ভারতীয় রুপি প্রচলনকারী শের শাহ সুরি

কালেমা খচিত ভারতীয় রুপি প্রচলনকারী শের শাহ সুরি

১৫৪০ সালে শের শাহ সুরি দ্বিতীয় মোগল বাদশাহ হুমায়ুনকে পরাজিত করে ভারতবর্ষের সিংহাসনে আরোহণ করেন। উপমহাদেশের কৃষি, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক অবকাঠামো ঢেলে সাজান। তার ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতবর্ষ উন্নতি ও নির্মাণের সোনালি যুগে প্রবেশ করে। দেশ পরিচালনার এক পর্যায়ে শের শাহ অবগত হন, রাজ্যের বর্তমান মুদ্রা ব্যবস্থা সমস্যায় জর্জরিত। লেনদেন-বাণিজ্য নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। ফলে সমস্যার সমাধানে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আকৃতিমূলক দিক নির্দেশনা দিয়ে একটি আধুনিক মুদ্রা চালুর নির্দেশ দেন।

১৫৪২ সালে ১১.৪ গ্রাম রৌপ্যে তৈরি একটি খসড়া মুদ্রা শের শাহের কাছে উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তুতকৃত মুদ্রাটি গভীর দৃষ্টিতে দেখে শের শাহ বলে ওঠেন, ‘এটা রুপিয়া!’ রুপিয়া সংস্কৃত শব্দ। অর্থ কাঁচা রুপা। তখন ভারতবর্ষে এককভাবে কোনো মুদ্রা চালু ছিল না। শের শাহ এই প্রাচীন শব্দকে পুনরায় চালু করে ৪৭৯ বছর আগের একটি নামকে এমনভাবে জীবিত করলেন, যেটা অধুনা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মরিশাস ইত্যাদি দেশের মুদ্রা হিসেবে চালু আছে।

শের শাহের আদেশে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে ‘রুপিয়া’ ব্যতীত স্বর্ণ ও তামা দ্বারা তৈরি ‘মোহর’ ও ‘পয়সা’ নামক মুদ্রারও ব্যাপক প্রচলন হয়। ফলে পুরো ভারতবর্ষের নাগরিকদের ব্যবসা-লেনদেন অনেক সহজ হয়ে যায় এবং অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কেন্দ্রীয় মুদ্রা চালু করার পর তিনি বিভিন্ন প্রদেশে চালু থাকা স্থানীয় মুদ্রা বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।

ভারতীয় ইতিহাসবিদ শশি শিব রামকৃষ্ণা ‘টেলজ অব দ্য রুপি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘রুপিয়াকে কেন্দ্রীয় মুদ্রা হিসেবে সুলতান শের শাহ ১৫৪২ সালে প্রচলন করেন। এই বিশেষ মুদ্রায় প্রায় ১২ গ্রাম রৌপ্য ছিল। ‘রুপিয়ার’ বিনিময়ে পণ্য সামগ্রীর আদান-প্রদান ‘রুপিয়াতে’ থাকা রৌপ্যের মূল্যমান হিসেবে নির্ধারণ করা ছিল।’

শের শাহ কর্তৃক প্রচলিত মুদ্রা মোগল বাদশাহরা এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও ইষৎ পরিমার্জন করে চালু রেখেছিল। এই মুদ্রায়ই ভারত-পাকিস্তানসহ আটটি দেশের মুদ্রার মূলভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে আছে।

গবেষক দোস্ত মুহাম্মদ খান ‘সিক্কাহ কি কাহানি আওর হামারে মুহাওয়ারে’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বর্তমানে রুপি নামে যে মুদ্রা চালু আছে, সেটা বর্তমান পর্যায়ে আসতে অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে। ‘রুপিয়া’ নামের মুদ্রা সর্বপ্রথম শের শাহ ১৫৪০-১৫৪৫ সালের দিকে চালু করেন। এই মুদ্রায় সাড়ে ১১ গ্রামের বেশি রৌপ্য ছিল। এছাড়া শের শাহ ‘মোহর’ নামে স্বর্ণমুদ্রা এবং ‘পয়সা’ নামে তামার মুদ্রা চালু করেছিলেন। বাদশাহ আকবর রাজত্বের শুরুতে শের শাহের মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছিলেন। এক ‘মোহরের’ বিনিময়ে দুই ‘রুপিয়া’ এবং এক ‘রুপিয়ার’ বিনিময়ে ৪০ ‘পয়সা’ পাওয়া যেত।’

ভারতীয় ইতিহাসবিদ আর পি ত্রিপঠি ‘রাইজ এন্ড ফল অব দ্য মোগল অ্যাম্পায়ার’ নামে নিজের বইতে লিখেছেন, ‘শের শাহ ভারতবর্ষের মুদ্রার বাজারদর বৃদ্ধি করেছিলেন। তুর্কি ও আফগান শাসকদের সময় ভারতবর্ষের মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস পেয়েছিল। পুরাতন, সাধারণ এবং মিশ্র মুদ্রার পরিবর্তে উন্নতমানের স্বর্ণ, রৌপ্য ও তামার মুদ্রা চালু করেছিলেন। শের শাহ প্রচলিত রৌপ্য মুদ্রা এত উন্নত মানের ছিল যে, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সেটাই প্রধান মুদ্রা ছিল। তিনি ‘দাম’ নামে তামার আরেকটি মুদ্রার প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। এই মুদ্রাকে চার-আট-বারো ও ষোল অংশে ভাগ করা যেত। কালেমা তৈয়বা এবং চার খলিফার নাম খোদিত মুদ্রা ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের’ জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য শের শাহ সুরি কর্তৃক প্রচলিত মুদ্রাগুলো রক্ষিত আছে। এই রৌপ্য মুদ্রার এক পিঠের মাঝের অংশে কালেমা তৈয়বা এবং কিনারার অংশে চার খলিফার নাম খোদিত রয়েছে। অপর পিঠের মাঝের অংশে আরবি অক্ষরে এবং কিনারার অংশে সংস্কৃত অক্ষরে শের শাহের নাম অঙ্কিত রয়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জাদুঘরের ওয়েব সাইটে প্রচারিত শের শাহের চালুকৃত ‘রুপিয়ার’ ছবি সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘শের শাহের চালুকৃত মুদ্রাকে ‘রুপিয়া’ বলা হয়। এটার ওজন প্রায় ১২ গ্রাম। মুদ্রার এক পিঠে কালেমা তৈয়বা এবং চার খলিফার নাম, অপর পিঠে ‘খল্লাদাল্লাহু মুলকাহু’, মুদ্রা তৈরির স্থানের নাম-তারিখ এবং আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় শের শাহের নাম খোদিত রয়েছে।’

ভারতীয় ইতিহাস গবেষক কালিকা রঞ্জন কানুনগো লিখেছেন, ‘শের শাহ কর্তৃক প্রচলিত মুদ্রায় ইসলামের চার খলিফার নামের নকশা থেকে প্রমাণিত হয়, শের শাহ সুন্নি মুসলমান ছিলেন, সিয়া নয়।’ লেখক নিজের আরেকটি বইতে লিখেছেন, ‘শরিফাবাদে তৈরি গোলাকৃতির মুদ্রায় হজরত আবু বকরের (রা.) নাম উপরে, হজরত ওসমানের (রা.) নাম নিচে, হজরত ওমরের (রা.) নাম ডানে এবং হজরত আলীর (রা.) নাম বাম দিকে রয়েছে। তিনি প্রথম ও শেষ ব্যক্তি, যিনি নিজের নামে আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় মুদ্রা চালু করেছিলেন।’

ঐতিহাসিক সায়্যিদ আহমদ মুরতজা লিখেছেন, ‘শের শাহ চালুকৃত মুদ্রায় কালেমা তৈয়বা, চার খলিফার নামের সঙ্গে সুলতান শের শাহ সুরি, ‘আল্লাহ তায়ালা তার রাজত্বকে দীর্ঘায়িত করুন’ বাক্য লেখা ছিল।’

ভারতীয় মুদ্রার নিয়ে গবেষণাকারী ওয়েবসাইট ‘কয়েন ইন্ডিয়া ডটকম’-এ শের শাহ কতৃর্ক গোলিয়ার (মধ্যপ্রদেশ), শেরগড় (পাঞ্জাব-পাকিস্তান), সাতগাঁওয়ে তৈরিকৃত মুদ্রার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এসব মুদ্রায় কালেমা তৈয়বা, চার খলিফা ও শের শাহের নাম অঙ্কিত রয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান কয়েন ডটকম’ নামের আরেকটি ওয়েব সাইটে বাংলা অঞ্চলে তৈরি মুদ্রার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বিক্রির জন্য। এসব মুদ্রায়ও পবিত্র কালেমা, চার খলিফা ও শের শাহের নাম রয়েছে। এই ওয়েব সাইট তৎকালীন এক মুদ্রার বিনিময়ে ভারতীয় ৩২০০ রুপি, পাকিস্তানি ৬৬৭৭ রুপি এবং আমেরিকান ৪৩ ডলার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।

কালিঞ্জর (বান্দা, উত্তর প্রদেশ) দুর্গের অস্ত্রাগারে লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে ১৫৪৫ সালের ২২ মে শের শাহ সুরি ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের পর প্রায় ১২ বছর মোগল বাদশাহ হুমায়ুন ভারতবর্ষ শাসন করেন। ১৫৫৬ সালে হুমায়ুনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র জালালুদ্দীন আকবর শাসন ক্ষমতা লাভ করেন। বাদশাহ আকবর নিজের শাসনামলে শের শাহের মুদ্রা ও অর্থব্যবস্থা চালু রেখেছিলেন। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস গবেষকরা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, শের শাহের মুদ্রা ও শাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকরী ছিল। ভারতবর্ষের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তার শাসনব্যবস্থা বিরাট ভূমিকা রেখেছে।

(সূত্র : ইনডিপেনডেন্ট উর্দু ও উইকিপিডিয়া)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত