ঢাকা শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ট্রাম্পের আঙুল কেটে ফেলার হুমকি ইরানি জেনারেলের

* ইরানে ৮০০ ফাঁসি স্থগিত, দাবি যুক্তরাষ্ট্রের * ইরানে বিক্ষোভে নিহত ২ হাজার ৬৭৭ জন, জানাল মানবাধিকার সংস্থা * ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র
ট্রাম্পের আঙুল কেটে ফেলার হুমকি ইরানি জেনারেলের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আঙুল কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছেন ইরানের বিপ্লবী গার্ডের জেনারেল মোহসিন রেজাই। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে তিনি এমন হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছেন তার হাত পিস্তলের ট্রিগারে। আমরা তার ওই হাত ও আঙুল কেটে ফেলব।’ এছাড়া এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তাহলে ইরান তার লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন বিপ্লবী গার্ডের এ জেনারেল। তিনি বলেন, “যদি আমরা সামনের দিকে (যুদ্ধ) যাই। তাহলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।” ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আমরা যে সংযম ও কৌশলগত ধৈর্য্য প্রদর্শন করেছি, আপনি সেগুলোকে বিবেচনায় নিচ্ছেন না। এ মুহূর্তে থামুন, পিছিয়ে যান। নয়ত এ অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্য) আপনাদের কোনো ঘাঁটিই সুরক্ষিত থাকবে না।” জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর দেশের প্রচেষ্টায় ইরানে হামলা চালানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন ট্রাম্প। এছাড়া পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, ট্রাম্প নিজে ইরানকে জানিয়েছেন তার হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই। তবে ট্রাম্পের এমন আশ্বাস বিশ্বাস করছে না ইরান সরকার। কারণ গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলার সময়ই ইরানে দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়।

ইরানে ৮০০ ফাঁসি স্থগিত, দাবি যুক্তরাষ্ট্রের : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ‘সব বিকল্পই বিবেচনায় রয়েছে’ বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। একইসঙ্গে তারা আবারও সতর্ক করে বলেছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে তেহরানকে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ মুখে পড়তে হবে। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসন ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন- ‘হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে।’

লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আজ জানতে পেরেছেন, গতকাল কার্যকর হওয়ার কথা থাকা ৮০০ ফাঁসি স্থগিত করা হয়েছে।’ তবে মৃত্যুদণ্ডগুলো সত্যিই স্থগিত হয়ে গেছে, এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি। তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট এবং তার প্রশাসন এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রেসিডেন্টের জন্য সব বিকল্পই খোলা রয়েছে।’ এর আগে যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দিয়ে বলেছিল, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে থাকে তবে দেশটিতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ চলবে। ইরানের দিক থেকেও পাল্টা হুমকি এসেছিল।

ইরানে মুদ্রার পতন, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানে প্রতিবাদে নামেন দোকানি ও ব্যবসায়ীরা। সেই প্রতিবাদ একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে রূপ নেয় সরকারবিরোধী আন্দোলনে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই বিক্ষোভে হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের অস্ত্রধারী দাঙ্গাবাজ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছে, এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রধান আঞ্চলিক মিত্র ইসয়েলের সমর্থন রয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালে শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে আল জাজিরা এই মৃত্যুর সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

ইরানে বিক্ষোভে নিহত ২ হাজার ৬৭৭ জন -মানবাধিকার সংস্থা : ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৬৭৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। একই সঙ্গে ১৯ হাজার ৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) গত মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করে।

সংস্থাটি জানায়, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও দমন অভিযানে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ বিষয়ে ইরানের সরকারি কর্তৃপক্ষ এখনও নিহত বা আহতের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

কীভাবে শুরু হয় বিক্ষোভ : গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে প্রথম বিক্ষোভের সূচনা হয়। সেখানে দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি, জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে এই অর্থনৈতিক আন্দোলন দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শহরে। এতে শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয় এবং বিক্ষোভ ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভে হতাহতের এই উচ্চ সংখ্যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক প্রস্তুতি পুনর্বিবেচনা করছে। এদিকে ইরানের প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক, যার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, তারা এ সংকটকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র গত বৃহস্পতিবার পাঁচ ইরানি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে নেপথ্যে থেকে ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনের পরিকল্পনা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখার মধ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, ইরানি নেতাদের অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোয় পাঠানো হচ্ছে কি না, সেদিকে তারা নজর রাখছে।

মার্কিন অর্থ দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কমান্ডারসহ মোট পাঁচ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ দমনের ‘মূল রূপকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

যুক্তরাষ্ট্র ফারদিস কারাগারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অভিযোগ, এ কারাগারে নারীরা ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অপমানজনক আচরণের’ শিকার হয়েছেন। এক ভিডিও বার্তায় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘ইরানের নেতাদের প্রতি ওয়াশিংটনের বার্তা স্পষ্ট। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জেনেছে যে আপনারা সংকটময় মুহূর্তে নিজেরা বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ইরানি পরিবারগুলোর কাছ থেকে চুরি করা অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা সেই অর্থ ও আপনাদের খুঁজে বের করব।’

বেসেন্ট আরও বলেন, ‘আপনারা আমাদের সঙ্গে একত্র হয়ে কাজ করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আছে। যেমনটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন যে সহিংসতা বন্ধ করুন এবং ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ান।’

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি মিশনের কাছ থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি। ইরানের শাসকগোষ্ঠী দেশটিতে অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য তাদের দীর্ঘদিনের শত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যেসব অর্থনৈতিক সমস্যা কেন্দ্র করে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার কিছু সমাধানের চেষ্টা করছে সরকার। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত বিনিময় হারের সমস্যাগুলো মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইরানে জিনিসপত্রের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে দেশটিতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার সূচনা হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলেছে, এ পর্যন্ত তারা ২ হাজার ৪৩৫ জন বিক্ষোভকারী ও ১৫৩ জন সরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি নিহত হওয়ার তথ্য যাচাই করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবারই বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানজুড়ে চলা বিক্ষোভ দমনে দেশটির শাসকগোষ্ঠীও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের স্বাধীনতা ও ন্যায়ের দাবির পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। অর্থ দপ্তর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নেপথ্যে থাকা সবাইকে শাস্তি দিতে সব ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করবে।’

মার্কিন অর্থ দপ্তর আরও ১৮ জনের ওপর পৃথক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘ছায়া ব্যাংকিং’ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করছিলেন। মূলত বিদেশি বাজারে ইরানের পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রির অর্থ পাচারের সঙ্গে তারা জড়িত বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

তেহরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া সর্বশেষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গতকালের এ পদক্ষেপ। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প আবার ইরানের ওপর তাঁর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি চালু করেছেন। এ প্রচারণার অন্যতম লক্ষ্য হলো, ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনা এবং দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা। তবে ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত