প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ছিল নির্বাসিত। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের রায় প্রতিফলিত হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ‘ভোটের গাড়ি’র প্রচারণা কেবল একটি সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং হারানো গণতন্ত্র ও নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক জোরালো প্রতীক।
সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে যে ভ্রাম্যমাণ প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তার ধরন ও বিষয়বস্তু গতানুগতিক সরকারি প্রচারণার চেয়ে ভিন্ন এবং গভীর। গতকাল শুক্রবার বাগেরহাটের গাংনি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে গাওলা ও কোদালিয়া পর্যন্ত এই গাড়ির যাত্রা সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো শিক্ষিত ও সচেতন ভোটার। ভোটাররা যখন জানতে পারেন যে তাদের একটি ভোট কেন মূল্যবান এবং কেন অতীতে তারা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তখনই গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হয়।
‘ভোটের গাড়ি’র মাধ্যমে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের সত্য তুলে ধরছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, আবরার ফাহাদ হত্যার নির্মমতা এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের মতো জাতীয় ক্ষতগুলোকে তরুণ ভোটারদের সামনে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, রাজনীতি ও ভোট দান শুধু একটি রুটিন কাজ নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার হাতিয়ার। অতীতে গণতন্ত্রহীনতার যে অন্ধকার অধ্যায় আমরা পার করেছি, সীমান্ত হত্যার যে গ্লানি আমাদের সইতে হয়েছে এবং তরুণ ও নারীরা যেভাবে বঞ্চিত হয়েছেন, সেই ইতিহাস ভুলে যাওয়া চলবে না। এই প্রামাণ্যচিত্রগুলো ভোটারদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা নীরবতা আবার সেই অন্ধকার সময়কে ফিরিয়ে আনতে পারে।
তবে শুধু প্রচারণা চালানোই যথেষ্ট নয়। ভোটের গাড়ির মাধ্যমে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা হচ্ছে, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে প্রকৃত ভোটের দিনে। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি একটি ভয়হীন নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ভোটাররা যেন শুধু ভোট দিতে কেন্দ্রে আসতেই উদ্বুদ্ধ না হন, বরং তাদের দেওয়া ভোটটি সঠিকভাবে গণণা হবে, এই নিশ্চয়তা পাওয়াও তাদের মৌলিক অধিকার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের আত্মত্যাগ এবং ১৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস সামনে রেখে ‘ভোটের গাড়ি’ যে বার্তা দিচ্ছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে জনগণের ইচ্ছাই শেষ কথা। গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া এই সচেতনতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক। অতীতের ভুল আর গণতন্ত্রহীনতাকে পেছনে ফেলে আমরা যেন এমন এক নির্বাচন উপহার পাই, যেখানে আবরার বা ফেলানীর মতো কোনো প্রাণ অকালে ঝরবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্বের সঙ্গে বলতে পারবেন, ’আমার ভোট আমি দিয়েছি’। ভোটের গাড়ি শুধু একটি বাহন নয়, এটি আমাদের নতুন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথে যাত্রার একটি মাইলফলক।