ঢাকা শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সবজি চাষে বিপ্লব : গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি

ওসমান গনি
সবজি চাষে বিপ্লব : গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি

বাংলাদেশের উর্বর পলিমাটি আর নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া যেন বিধাতার এক বিশেষ আশীর্বাদ। এদেশের বিশাল জনপদকে একসময় শুধু ধান আর পাটের দেশ হিসেবে গণ্য করা হলেও সময়ের বিবর্তনে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। আজ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং আশাব্যঞ্জক খাতের নাম সবজি চাষ। একসময় বাড়ির আঙিনায় বা ঘরের চালে শুধু নিজেদের পরিবারের প্রাত্যহিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য যে সবজি চাষ হতো, তা আজ বাণিজ্যিক রূপ নিয়ে বিশাল এক শ্রমঘন শিল্পে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে সবজি চাষ আজ শুধু পুষ্টির জোগান দিচ্ছে না, বরং তা হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অস্ত্র। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এদেশের কঠোর পরিশ্রমী কৃষক, কৃষি বিজ্ঞানী, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতার এক সফল মহাকাব্য।

বিগত দুই দশকে সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তা বিশ্ব দরবারে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, সবজি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর অন্যতম। এটি শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, বরং বৈচিত্র্যের দিক থেকেও বিস্ময়কর। একসময় আমরা শুধু শীতকালীন কয়েক পদের সবজির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে গবেষণার ফলে গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালেও প্রচুর পরিমাণে সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। বারোমাসি সবজি চাষের এই সংস্কৃতি কৃষকদের সারা বছর আয়ের পথ সুগম করে দিয়েছে, যা আগে ধান চাষের ক্ষেত্রে সম্ভব ছিল না। শীতের কুয়াশা মোড়া ভোরে যখন সবজি বোঝাই ট্রাকগুলো গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে বড় শহরের পাইকারি বাজারের দিকে রওনা দেয়, তখন সেই ট্রাকের প্রতিটি চাকা যেন গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণভোমরাকেই সচল রাখে। লাউ, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি থেকে শুরু করে হালের করলা, পটল, ঝিঙে আর টমেটো- সবই আজ কৃষকের হাতে প্রতিদিন নগদ অর্থ তুলে দিচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

সবজি চাষের এই জোয়ার গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। প্রথাগত ধান বা গম চাষে শ্রমের প্রয়োজন হয় বছরের নির্দিষ্ট কিছু মৌসুমে, ফলে বছরের বাকি সময় কৃষি শ্রমিকদের বেকার থাকতে হতো। কিন্তু সবজি চাষ অত্যন্ত শ্রমঘন হওয়ার কারণে এখানে বীজ তলা তৈরি থেকে শুরু করে চারা রোপণ, নিড়ানি দেওয়া এবং ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত সারা বছরই শ্রমিকদের কাজের সুযোগ থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের জন্য সবজি চাষ এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সবজি তোলা, ধোয়া, মান অনুযায়ী বাছাই করা এবং আধুনিক উপায়ে প্যাকিং করার কাজে এখন বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক অংশগ্রহণ করছেন। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবারগুলোতে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা গ্রাম থেকে শহরে কর্মসংস্থানের খোঁজে ছুটে আসা মানুষের স্রোত কিছুটা হলেও হ্রাস করেছে, যা নগরায়নের চাপ কমাতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে।

এই অভাবনীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে উচ্চফলনশীল বীজ এবং আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। এদেশের কৃষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞাননির্ভর এবং প্রযুক্তিবান্ধব। তারা সারের পরিমিত ব্যবহার, ক্ষতিকর রাসায়নিকের বদলে ফেরোমোন ট্র্যাপ বা জৈব বালাইনাশকের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি আয়ত্ত করেছে। বিশেষ করে পলিহাউস, নেট হাউস এবং মালচিং পদ্ধতির মতো আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহারের ফলে অতিবৃষ্টি বা প্রখর রোদের মতো প্রতিকূল আবহাওয়াতেও এখন মানসম্মত সবজি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন হেক্টর প্রতি উৎপাদনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে, অন্যদিকে সবজির বাহ্যিক রূপ ও গুণগত মানও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনের প্রভাবে জৈব সার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের হারও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শুধু দেশের সুস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারের কঠোর মানদ- পূরণে আমাদের সবজিকে প্রস্তুত করছে।

তবে সবজি চাষের এই উজ্জ্বল চিত্রের আড়ালে কিছু গভীর চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে যা নিরসন করা জরুরি। বাংলাদেশের সবজি চাষের প্রধান অন্তরায় হলো যথাযথ উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব। প্রতি বছর উৎপাদিত সবজির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শুধু সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এবং পরিবহনের সময় নষ্ট হয়ে যায়। এই বিশাল অপচয় কৃষকের কষ্টার্জিত লাভের অংশ কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশাল দৌরাত্ম্য গ্রামীণ অর্থনীতির এই চালিকাশক্তিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। কৃষক যে দামে মাঠপর্যায়ে সবজি বিক্রি করে, শহরের সাধারণ ভোক্তাকে তার কয়েক গুণ বেশি দামে তা কিনতে হয়। এই লাভের সিংহভাগই চলে যায় ফড়িয়া বা পাইকারদের পকেটে, অথচ মূল কারিগর কৃষক অনেক সময় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খায়। গ্রামীণ পর্যায়ে যদি সমবায়ের ভিত্তিতে স্থানীয় হিমাগার স্থাপন করা যেত এবং সরাসরি কৃষকের সঙ্গে বড় শহরের চেইন শপ বা পাইকারি বাজারের ডিজিটাল সংযোগ ঘটানো যেত, তবে এই বিপ্লবের প্রকৃত সুফল কৃষক সরাসরি ভোগ করতে পারত।

সবজি রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় খাত। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের কিছু নির্দিষ্ট বাজারে বাংলাদেশের সবজি যাচ্ছে, তবে তা আমাদের উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় খুবই নগণ্য। আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্যাকিং হাউস, কুলিং ভ্যান এবং ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেশনের (Phytosanitary Certification) সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা উন্নত দেশগুলোর বড় বড় বাজার পুরোপুরি ধরতে পারছি না। বিমানবন্দরের কার্গো সুবিধা বৃদ্ধি এবং কোল্ড চেইন লজিস্টিকসের আমূল উন্নয়ন ঘটাতে পারলে সবজি রপ্তানি হতে পারে তৈরি পোশাক শিল্পের পর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। গ্রামীণ অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে কেবল উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং এই উৎপাদিত পচনশীল পণ্যের জন্য একটি বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক বাজার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সবজি চাষকে টিকিয়ে রাখা কৃষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অসময়ে বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা লোনা পানির অনুপ্রবেশের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের পুঁজি কেড়ে নেয়। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় শস্য বিমা (Crop Insurance) চালুর বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্রতিটি কৃষিপ্রধান উপজেলায় সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বা এগ্রো-প্রসেসিং জোন গড়ে তোলা গেলে পচনশীল এই পণ্যের মূল্য সংযোজন (Value Addition) করা সম্ভব হতো। টমেটো থেকে সস, আলু থেকে চিপস বা সবজির পাউডার তৈরির মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো যদি গ্রাম পর্যায়ে গড়ে ওঠে, তবে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। এতে যেমন বেকারত্ব দূর হবে, তেমনি পচনের হাত থেকে রক্ষা পাবে কৃষকের কষ্টের ফসল।

বাংলাদেশের সবজি চাষের এই বিপ্লব শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা পুষ্টির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, বরং এটি একটি আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদ এখন আর শুধু অভাব-অনটনের আখ্যান নয়, বরং সবজি চাষের বদৌলতে গ্রামগুলো এখন একেকটি অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। কৃষকের ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই সাফল্যকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পিত নীতি নির্ধারণ, সহজশর্তে কৃষিঋণ এবং অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন। সবুজের এই নীরব বিপ্লবই হোক উন্নত ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশের মূলভিত্তি। সরকার, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবজি চাষ হবে, আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনীতির তুরুপের তাস।

পরিশেষে বলা যায়, সবজি চাষের এই নীরব বিপ্লব বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এটি এখন আর শুধু কৃষকের জীবনধারণের মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির এক শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

যথাযথ সংরক্ষণাগার নির্মাণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিরসন এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও গতিশীল হলে সবজি চাষই হবে বাংলাদেশের আগামীর ‘সাদা সোনা’। কৃষকের শ্রম আর আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে এই সবুজ বিপ্লব শুধু গ্রামকে স্বাবলম্বী করবে না, বরং উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথকে আরও প্রশস্ত করবে। সবুজের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ওসমান গনি

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত