
চান্দিনা উপজেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন হারং গ্রামের পরিশ্রমী কৃষক মফিজ মিয়া। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি আর সঠিক জাত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি এখন সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চান্দিনা পৌর ব্লকের এই নিভৃত পল্লির মাটিতে মফিজ মিয়া ৪২ শতাংশ জমিতে আবাদ করেছেন উচ্চফলনশীল ‘বাহুবলি’ জাতের টমেটো। বর্তমানে তার খেতজুড়ে ঝুলে থাকা লাল-সবুজ টমেটোর হাসি যেন তার আগামীর স্বপ্নপূরণের বার্তাই দিচ্ছে। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধান।
শুরুতে এই আবাদ নিয়ে মফিজ মিয়ার মনে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও এখন তা আনন্দে রূপ নিয়েছে। ৪২ শতাংশ জমিতে টমেটোর এই বিশাল বাগান তৈরি করতে চারা রোপণ, সার, কীটনাশক, মাচা তৈরি এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ এখন পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে- মোট ৭০ হাজার টাকা। চাষের শুরুতে যখন বাজারে আগাম টমেটোর চাহিদা ছিল তুঙ্গে, তখনই তিনি প্রথম দফার টমেটো বাজারে তুলে ৩০ হাজার টাকা ঘরে তুলতে সক্ষম হন। এটি ছিল তার জন্য বড় এক আত্মবিশ্বাস। বর্তমানে টমেটোর ফলন যেমন বেড়েছে, তেমনি বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাইকারি বাজারে এখন তিনি প্রতি কেজি টমেটো ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। মফিজ মিয়ার এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন চান্দিনা পৌর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার। চারা নির্বাচন থেকে শুরু করে সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক মালচিং পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার নিয়ে তিনি শুরু থেকেই মফিজ মিয়াকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। কৃষি অফিসের এই নিবিড় পরামর্শের কারণেই প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করে টমেটোর গাছগুলো সতেজ ও রোগমুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে। মাঠপর্যায়ে গিয়ে গোলাম সারোয়ারের নিয়মিত তদারকি মফিজ মিয়ার মতো অন্যান্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করছে নতুন নতুন ফসল চাষে। বাহুবলি জাতের টমেটোর বৈশিষ্ট্য হলো এর আকার বেশ বড় এবং দীর্ঘসময় তা সতেজ থাকে। এছাড়া এই জাতটি উচ্চফলনশীল হওয়ায় অল্প জমিতে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়। মফিজ মিয়ার বাগানে বর্তমানে যে পরিমাণ টমেটো রয়েছে এবং ফলনের যে ধারাবাহিকতা বজায় আছে, তাতে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি স্বপ্ন দেখছেন, চলতি মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত এই জমি থেকে তিনি প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকার টমেটো বিক্রি করতে পারবেন। ৭০ হাজার টাকা খরচ করে এই বিশাল অঙ্কের আয়ের হাতছানি তাকে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে অনুপ্রেরণার মূর্ত প্রতীক করে তুলেছে। হারং গ্রামের এই দৃশ্য এখন প্রতিদিনের। মফিজ মিয়ার টমেটো খেত দেখতে অনেকেই ভিড় করছেন। অনেকে তার কাছে চাষাবাদের নিয়মকানুন সম্পর্কে জানতে চাইছেন।
স্থানীয় কৃষকরা মনে করছেন, সরকারি সহযোগিতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে চান্দিনার অনেক পতিত জমিতেই এমন সোনার ফসল ফলানো সম্ভব। মফিজ মিয়ার এই সাফল্য শুধু তার একার নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবের এক ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। একদিকে শ্রম আর অন্যদিকে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটলে যে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা যায়, মফিজ মিয়া আজ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মাঠের এই সবুজ বিপ্লব আগামীতে স্থানীয় পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট সবাই আশা করছেন।