
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ আজ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। মেলা শুরুর আগের দিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেখা গেছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ব্যস্ততা। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার কর্মীরা স্টল সাজানো, বই গোছানো ও ব্যানার-ফেস্টুন টানানোর কাজে সময় পার করছেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, মেলার মূল ভেন্যু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে তৈরি করা হয়েছে সারিবদ্ধ স্টল। কোথাও কাঠের কাঠামোয় রঙের শেষ প্রলেপ, কোথাও বইয়ের তাক বসানো, আবার কোথাও নতুন প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের প্রস্তুতি চলছে।
স্টলগুলোর সামনে টানানো হয়েছে প্রকাশনীর নামফলক ও আলোকসজ্জা। কর্মীরা বইয়ের প্যাকেট খুলে শেলফে সাজিয়ে রাখছেন নতুন ও পুরোনো বই। শিশু-কিশোর কর্নার, গবেষণাধর্মী বই, কথাসাহিত্য ও কবিতার বই আলাদা করে প্রদর্শনের প্রস্তুতিও চলছে।
মেলা উপলক্ষে নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনাও জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠ পরিদর্শন করছেন। দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে আগেই।
রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ কন্ট্রোল রুম, র্যাবের স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্সের অস্থায়ী ক্যাম্প এবং আনসার প্লাটুনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। এর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ একটি ব্রেস্টফিডিং (মাতৃদুগ্ধ পান) কর্নার স্থাপন করেছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর উদ্বোধন বিষয়ে মেলার সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেলা ২টায় বইমেলার উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ তুলে দেবেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে বলে জানিয়েছে বইমেলা কর্তৃপক্ষ। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এবারের বইমেলায় ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করবে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি, মোট ইউনিট থাকবে ১ হাজার ১৮টি।
মবের আশঙ্কা নেই, তবুও প্রস্তুতি রাখব - অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার : বইমেলায় মবের কোনো আশঙ্কা নেই, তবুও প্রস্তুতি রাখব বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরওয়ার। গতকাল বুধবার সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলায় নিরাপত্তা উপলক্ষ্যে এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণসহ আশপাশের এলাকায় বাংলা একাডেমি এই বইমেলার আয়োজন করছে। প্রতিবারের মতো এবারও বইমেলাকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। রাতে কন্ট্রোল রুমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকিতে থাকবেন। বইমেলা সার্বিক নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জানান, বইমেলায় বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান গেট কেন্দ্রিক এবং আভ্যন্তরিক কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। ইউনিফর্ম পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশের বিশেষ টিম মোতায়ন থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লোক সমাগম বেশি হবে বিধায় ওই সময়ে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। মেলা প্রাঙ্গণ কেন্দ্রিক ফুট পেট্রোল ব্যবস্থা এবং মুক্ত মঞ্চ কেন্দ্রিক বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকবে। বইমেলার প্রবেশ মুখে মেটাল ডিটেক্টর এবং আর্চওয়ে দ্বারা মানুষের প্রবেশের সময় চেকিংয়ের পাশাপাশি ম্যানুয়াল টেকিং ব্যবস্থা থাকবে।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ধারালো বস্তু, বিস্ফোরক দ্রব্য কিংবা দাহ্য পদার্থ নিয়ে বইমেলায় কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ৩০০ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে মেলার ভেতরে এবং চারপাশে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। ডগ স্কোয়াড দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের এলাকা সুইপিং করা হবে। হকার, ছিনতাইকারী ও পকেটমারের তৎপরতা রোধে বিশেষ টিমের ব্যবস্থা থাকবে। মেলায় আগত নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। বইমেলা কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রবেশ পথে নিরাপত্তা ব্যারিকেড স্থাপন করা হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জানান, বইমেলা প্রাঙ্গণে ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। রাত্রিকালে পর্যাপ্ত সার্চলাইট-এর ব্যবস্থা রাখা হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের ডিবি, সিটিটিসি, বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট, সোয়াত টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। বইমেলায় লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার, ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার, হেল্প ডেক্স ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র থাকবে। মেলায় বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা থাকবে।
বইমেলা উপলক্ষ্যে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ট্রাফিক বিভাগ থেকে কয়েকটি ডাইভারশন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনে এবং রাতে কোন বাড়ি গাড়ি প্রবেশ করবে না। আগের মতো দোয়েল চত্বর এবং টিএসসি এলাকায় রাস্তা সবসময় বন্ধ থাকবে না ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিকে মাঝেমধ্যে খুলে দেওয়া হবে, বলেও জানান তিনি।
বইমেলা ঘিরে মবের কোনো আশঙ্কা আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মবের কোনো আশঙ্কা নেই, তবুও আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।
সাংবাদিকদের আরেকটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের গোয়েন্দা তথ্যে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা নেই। সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।