
বন্ধ কলকারখানা আবার চালুর উদ্যোগে সক্রিয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই আশ্বাসের কথা বলেন তিনি। সভায় মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দেবে। পাশাপাশি চলমান সংস্কারকাজ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের নতুন গভর্নরের উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন।
আরিফ হোসেন খান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন নতুন গভর্নর। সভায় তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হওয়ায় গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযমী থাকবেন নতুন গভর্নর। তবে তথ্যপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে একজন মুখপাত্রের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও আগের গভর্নরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে নতুন গভর্নর বলেন, এখন লক্ষ্য হচ্ছে সেই স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো আবার চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুবিধা ও ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সভায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন গভর্নর। একই সঙ্গে বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, এমন উচ্চ সুদের হারের বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন করা হবে বলে জানান গভর্নর। কাজের গতি বাড়াতে ‘ডেলিগেশন অব অথরিটি’ বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ ছাড়া সরকারের অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে গভর্নর বলেন, সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব। সবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি সমুন্নত রেখে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান নবনিযুক্ত গভর্নর।
কাজ শুরু করি, তারপর কথা বলা যাবে- গভর্নর : বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করেছেন নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। ব্যাংকের তিনজন ডেপুটি গভর্নর এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এসেছি; কাজ শুরু করি; তারপর কথা বলা যাবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক ঘুরে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন গভর্নর : উত্তাপ ছড়ানো ঘটনাবলীল মধ্যে দায়িত্ব পাওয়ার পরদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ সেরে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা ৩৪ মিনিটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দপ্তরে আসেন তিনি; তাকে নিয়ে আসেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক।
গভর্নর অর্থমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করলেও সচিব নাজমা অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিবের কক্ষে অপেক্ষায় থাকেন। ৪টার পর সাক্ষাৎ শুরু হয়, তাতে যোগ দেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব। এর আগে এডিবির সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন অর্থমন্ত্রী। তাই গভর্নরকে তার কক্ষে নিলেও তখন নাজমা মোবারেক অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিবের কক্ষে অপেক্ষায় ছিলেন। এদিন বেলা ১০টা ৪০ মিনিটে নতুন গভর্নর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পৌঁছলে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান ডেপুটি গভর্নর ও গভর্নর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। তিনি এলিয়ন সিরিজের এ-১৫ মডেলের গাড়িতে চড়ে কর্মস্থলে আসেন। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, আগে কাজ করি তারপরে কথা বলব। যোগদান করি...।
উল্লেখ্য, নতুন গভর্নর বসানো হবে, এমন গুঞ্জনেরে মধ্যে বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়েন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। যাওয়ার আগে দেখেন তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। পরে কর্মকর্তাদের তোপের মুখে অফিস ছাড়তে বাধ্য হন তার এক উপদেষ্টাও। নজিরবিহীন এমন উত্তাপ ছড়ানো ঘটনাবলীর মধ্যে বিকালের দিকে পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নরের দায়িত্ব দেয় তারেক রহমানের বিএনপি সরকার। এর আগে অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও শিক্ষকদের মধ্যে থেকে গভর্নর হলেও এবারই প্রথম ব্যবসায়ীকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।