
পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত শরীয়তপুর জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের পলিযুক্ত উর্বর বালুমাটি কৃষি উৎপাদনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে এই মাটির গঠন, পানি নিষ্কাশনের সুবিধা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ তরমুজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এবার পরীক্ষামূলকভাবে বড় পরিসরে তরমুজের আবাদ শুরু হয়েছে। কৃষি বিভাগের উদ্যোগে উন্নত জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে মোট ১৬৪ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাজিরার নাওডোবায় মাঠ দিবসের আয়োজন করা হড। প্রদর্শনীগুলোতে কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার, জৈব বালাইনাশক, কীটনাশক প্রদান করা হয়েছে। সঠিক চাষপদ্ধতি নিশ্চিতের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, চরাঞ্চলের পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শরীয়তপুরসহ সারা দেশে প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ১৯১টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে চাষাবাদ পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের তরমুজ চাষে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটা এলাকার অভিজ্ঞ কৃষি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কুয়াকাটার ২১ জন কৃষি উদ্যোক্তা জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করছেন। এছাড়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে আরও ১৪ বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ করা হয়েছে।
নাওডোবা ইউনিয়নের বেপারীকান্দি গ্রামের কৃষক কাশেম আলী বলেন, আমাদের এলাকায় আগে কখনও তরমুজের চাষ হয়নি। এবার প্রথমবারের মতো তরমুজের চাষ দেখতে পাচ্ছি। যদি ফলন ভালো হয় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়, তাহলে আগামী বছর স্থানীয় কৃষকরাও তরমুজ চাষে আগ্রহী হবে।
কুয়াকাটা এলাকার অভিজ্ঞ কৃষক আল আমীন জানান, নাওডোবা এলাকায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমি দীর্ঘদিন ধরে পতিত অবস্থায় পড়ে ছিল। কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা সেখানে তরমুজের আবাদ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, আমরা আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজের চাষ করছি। তবে এবার বৃষ্টির অভাবে ফলন পেতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। ১৫-২০ দিন আগে বৃষ্টি হলে রোজার শুরু থেকেই তরমুজ বাজারে আনা যেত। এখন বৃষ্টি হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই খেতের অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছি। ঈদের পর থেকেই তরমুজ বাজারে তোলা সম্ভব হবে। এই প্রকল্পে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় কোনো সমস্যা না হলে কোটি টাকার বেশি তরমুজ বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।
নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রেজাউল করিম বলেন, আমাদের চরাঞ্চলের পলিযুক্ত উর্বর বালুমাটি তরমুজ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি বিভাগ যদি উন্নত জাতের বীজ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেয়, তাহলে স্থানীয় কৃষকরাও ব্যাপকভাবে তরমুজ চাষে এগিয়ে আসবে। এতে করে চরাঞ্চলের পতিত জমি কাজে লাগবে এবং কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
জাজিরার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, আমার কর্ম এলাকার চরাঞ্চলসহ পলিযুক্ত উর্বর বালুমাটিতে তরমুজ চাষের জন্য নাওডোবার ১৫০ বিঘাসহ মোট ১৭টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১৬৪ বিঘা জমিতে উচ্চমূল্যের ফসল তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আমরা সার্বক্ষনিক পরামর্শ, সহায়তা ও তদারকি করে যাচ্ছি। যদি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় তাহলে আগামীতে তরমুজের আবাদ অনেক বৃদ্ধি পাবে। কারণ তরমুজ একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল।
বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের মাটির গুণাগুণ কাজে লাগিয়ে নতুন জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ১৯১টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ এবং পরিকল্পিত চাষাবাদের বিষয়ে সার্বিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে শরীয়তপুরসহ দেশের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের কৃষকরা তরমুজ চাষের মাধ্যমে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারবেন। পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগ সফল হলে আগামী বছর শরীয়তপুরসহ সারা দেশের চরাঞ্চলে তরমুজ চাষের পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে যেমন পতিত জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, তেমনি স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের পথও সুগম হবে।