
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। লন্ডনের স্থানীয় সময় গত রোববার ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে আয়োজিত ২৬তম কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান। কমনওয়েলথভুক্ত ৫৬টি দেশের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে অংশ নেন।
অধিবেশনে খলিলুর রহমান মিয়ানমার থেকে আসা ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর যে অসহনীয় বোঝা তৈরি হয়েছে, সেই বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এখনও নতুন করে রোহিঙ্গা আসছে। তাদের জন্য মানবিক সহায়তা ক্রমান্বয়ে কমে আসায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরবচ্ছিন্ন সম্পৃক্ততা বজায় রাখার অনুরোধ জানান। সম্মেলনে খলিলুর রহমান জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো অস্তিত্ব সংকটের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠকের লক্ষ্য ও আলোচ্যসূচি এই সম্মেলনে নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও রীতিনীতি লঙ্ঘনের ফলে বিশ্ব বর্তমানে যে কঠিন সময় পার করছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
খলিলুর রহমান বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং এই সম্মেলনে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকতে পেরে গর্ব প্রকাশ করেন। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পর্যবেক্ষণে উচ্চপর্যায়ের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো এবং নির্বাচনের সফল সমাপ্তির প্রশংসা করে প্রতিবেদন দেওয়ায় তিনি কমনওয়েলথ সচিবালয়কে ধন্যবাদ জানান।
সম্মেলনের ফাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী ইভেট কুপারের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া, কানাডার পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি রবার্ট অলিফ্যান্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিষয়ক উপমন্ত্রী আলভিন বোটেস, অ্যান্টিগুয়া ও বারমুডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেট গ্রিন এবং ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুদজেতো অ্যাব্লাকওয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি প্রধানদের সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার বিষয়ে সমর্থন চান খলিলুর রহমান। এছাড়া আজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কমনওয়েলথ দিবস উপলক্ষে সেন্ট জেমস প্যালেসে আয়োজিত এক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থীকে সমর্থনের আশ্বাস তুরস্কের : ২০২৬-২০২৭ মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থীর প্রতি সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে তুরস্ক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গতকাল সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ আশ্বাস দেন। বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী ইউএনজিএ’র ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থীর প্রতি তুরস্কের সমর্থন কামনা করেন। জবাবে রাষ্ট্রদূত সেন জানান, তুরস্ক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন দেবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ায় শামা ওবায়েদ ইসলামকে অভিনন্দন জানান তুরস্কের রাষ্ট্রদূত এবং দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানিয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অভিন্ন মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য এবং গভীর সভ্যতাগত বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
উভয় পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ইতিবাচক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যের প্রতি জোর দেন। প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে তুরস্কের আরও বেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানান এবং এ ধরনের উদ্যোগকে সহজতর করার প্রস্তুতি ব্যক্ত করেন।
তিনি দুই দেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয় গুরুত্বারোপ করেন।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য তুরস্ক সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকার প্রতি আঙ্কারার অব্যাহত সমর্থনের প্রশংসা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রতিমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা বিনিময়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তুর্কি সংস্কৃতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তিনি সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও জোরদার করতে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ তুর্কি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।
জবাবে রাষ্ট্রদূত সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনুস এমরে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার বিদ্যমান প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ প্রাথমিকভাবে একটি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে শুরু হতে পারে এবং পরে বিস্তৃত সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে সম্প্রসারিত হতে পারে। প্রতিমন্ত্রী আরও আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে বাংলাদেশ-তুরস্ক সংসদীয় বন্ধুত্ব গ্রুপকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে আইনসভা ও দুদেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়।