ঢাকা বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পাকিস্তানের বিমান হামলায় ‘নিহত ৪০০ আফগান’

পাকিস্তানের বিমান হামলায় ‘নিহত ৪০০ আফগান’

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছেন বলে গতকাল মঙ্গলবার আফগান তালেবান সরকারের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবর জানিয়েছে।

তবে পাকিস্তান এই দাবিকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত সোমবার রাতে চালানো অভিযানে সুনির্দিষ্টভাবে কেবল সামরিক স্থাপনা এবং সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়া অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে চীনের মধ্যস্থতার আশ্বাস এবং উভয়পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বানের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই এই বিমান হামলা চালানো হয়।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার চলমান সংঘাত এখন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে চীনসহ কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও সাম্প্রতিক হামলার পর আবারও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

এই উত্তেজনা এমন এক সময় বাড়ছে, যখন পুরো অঞ্চলজুড়েই অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য এরইমধ্যে গভীর সংকটে পড়েছে।

ঘটনাস্থলে একটি একতলা ভবনে আগুনের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। অন্যান্য স্থানে ভবনগুলো ধসে পড়ে কাঠ ও ধাতুর স্তূপে পরিণত হয়েছিল। কোথাও কোথাও কেবল কয়েকটি দোতলা বিছানা অক্ষত ছিল, আর চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল কম্বল, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও বিছানাপত্র।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ওঠে আসে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির চিত্র। অ্যাম্বুলেন্স চালক হাজি ফাহিম রয়টার্সকে জানান, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন চারদিকে আগুন জ্বলছে এবং মানুষ পুড়ছে। ভোরে তাকে আবার ডাকা হয়, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে তখনও বহু মরদেহ চাপা পড়ে ছিল।

ক্ষতিগ্রস্ত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের গেটের সামনে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ি অবস্থান নিতে দেখা গেছে। ভবনের সাইনবোর্ড অনুযায়ী, এটি ছিল এক হাজার শয্যার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। ঘটনাস্থলে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সেখানে নিরাপত্তাকর্মীদের মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। তালেবানের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত জানিয়েছেন, সোমবার রাত ৯টার দিকে বিমান হামলাটি চালানো হয়। তার দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল সরকারি ‘ওমিদ’ হাসপাতাল, যা ছিল দুই হাজার শয্যার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হামলায় হাসপাতালের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এতে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৪০০-এ পৌঁছেছে এবং অন্তত ২৫০ জন আহত হয়েছেন। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দাপ্তরিক সময়ের বাইরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তালেবানের এই দাবিকে ‘ভুল তথ্য উপস্থাপন’ বা ‘অপপ্রচার’ বলে উল্লেখ করেছে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মন্ত্রণালয় জানায়, কাবুল ও নানগারহারে আফগান তালেবান এবং পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) গোষ্ঠীর সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসীদের সহায়তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব স্থাপনায় কারিগরি সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ মজুত ছিল, যা পাকিস্তানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল।

আফগানিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং এতে বেসামরিক হতাহতের খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি উভয় পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং হাসপাতালসহ বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তাদের মধ্যে গত মাসে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়। উভয়পক্ষই একে অপরের ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে, তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইসলামাবাদের অভিযোগ, কাবুল পাকিস্তানি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালাচ্ছে। তবে তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, জঙ্গিবাদ দমন করা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত