
ইরানে হামলা-পাল্টাহামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের সংকটে পড়েছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। টানা প্রায় একমাস ফিলিং স্টেশন থেকে যানবাহনের তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে যানবাহনের চালক ও মালিকদের। যদিও সরকার বারবার বলছে জ্বালানি তেল সংকট নেই, তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চিত্র ভিন্ন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পাম্পগুলো থেকে চাহিদা মতো তেল না পাওয়া এবং অনেক পাম্প বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। তবে বেশি বিড়ম্বনায় পড়েছেন রাইড শেয়ারিং চালকরা। জ্বালানি তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় তারা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
গতকাল রোববার রাজধানীর বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, তেল বিক্রি কার্যক্রম চালু থাকা পাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। এসব পাম্পের সামনে অপেক্ষারত যানবাহন চালকদের সঙ্গে কথা বললে এমন ভোগান্তির দ্রুত অবসান চান তারা।
গত শনিবার সকালেও রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটা পাম্পের সামনেই জ্বালানি তেল নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ সারি।
গতকাল রোববার রাজধানীর এসব ফিলিং স্টেশনের সামনে যানবাহন চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেলচালক সজীবের সঙ্গে। তিনি কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, বাইক চালিয়েই সংসার চলে, আমি চলি। রাইড শেয়ারিং করি। এতদিন ঈদের ছুটি ছিল, তেমন যাত্রী ছিল না। কিন্তু এখন তো ছুটি শেষ। আমাদেরও কিছু ইনকাম করতে হবে। বাড়িতে টাকা পাঠাতে হবে। কিন্তু তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে প্রয়োজন মতো তেল পাচ্ছি না। সবদিক লস হচ্ছে। না পাচ্ছি তেল, না মারতে পারছি ভাড়া। সরকার তো বলছে তেলের অভাব নেই। তাহলে তেল পাচ্ছি না কেন!
আরেক মোটরসাইকেলচালক আরমান বলেন, পর পর দুদিন পাম্পের লাইনে প্রায় ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অধৈর্য হয়ে ফিরে গেছি। কিন্তু আর তেল না নিয়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তেলের জন্য প্রতিটা দিন এমন ভোগান্তি আর ভালো লাগে না। তেলের তো সংকট নেই। সরকারের উচিত তেলের দিকে নজর দেওয়া। অভাব নেই, কিন্তু গেলো কই? উত্তরের ৮ জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ: জ্বালানি তেল পরিবহণের কাজে নিয়োজিত ট্যাংকলরি চালকসহ তিনজন শ্রমিককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানা করার প্রতিবাদে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেছে ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন।
গতকাল রোববার সকাল থেকে এ কর্মসূচি পালন করছে সংগঠনটি। ফলে উত্তরের ৮ জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
জ্বালানি তেল পরিবহণের সময় তিনজন শ্রমিককে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা দেওয়ার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। এর ফলে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহসহ সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়েছে। পেট্রল পাম্প মালিকরাও শ্রমিকদের এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল নিয়ে নীলফামারীর দিকে যাওয়ার সময় একটি তেলবাহী লরিতে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। সেটি ঠিক করতে গাড়িটি থামিয়ে কেবিন খুলে তারা মেরামতের কাজ করছিলেন। এ সময় নীলফামারী জেলার এনডিসি নিয়াজ ভূঁইয়া সড়কে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। তিনি লরিটি তল্লাশি করে কেবিনে দুটি জারকিনে ১০ লিটার পেট্রল ও ২ লিটার ডিজেল উদ্ধার করেন।
পরে অবৈধভাবে তেল বহনের অভিযোগে একরামুল হক, চালক শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র ও সহকারী রিফাতকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন এবং তিনজনের ওপর মোট এক লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকে শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেন। দুপুরে তারা পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর সামনে সমাবেশ করেন এবং পরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, সড়ক ও মহাসড়কে পুলিশি হয়রানি এবং অযৌক্তিকভাবে ট্যাংকলরি চালক, ম্যানেজার ও সহকারীদের জেল-জরিমানা করার প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা দ্রুত নিয়াজ ভূঁইয়ার অপসারণ এবং দণ্ডপ্রাপ্ত শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন অব্যাহত রাখারও ঘোষণা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আতাউর রহমান জানান, অবিলম্বে জেল হাজতে পাঠানো শ্রমিকদের মুক্তির পাশাপাশি অভিযুক্ত এনডিসি নিয়াজ ভূঁইয়াকে অপসারণ করা না হলে কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, জেল-জরিমানায় হাজতে পাঠানো শ্রমিকদের মুক্তির দাবিতে ধর্মঘট চলছে। আমরা আলটিমেটাম দিয়েছি শ্রমিক ভাইদের নিঃশর্ত মুক্তি ও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এনডিসির অপসারণ না হলে আমাদের ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। আমাদের সঙ্গে পাম্প মালিকরাও একাত্মতা ঘোষণা করেছেন।
ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব কী, জানালো সরকার:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে দেশে তৈরি হওয়া জ্বালানি তেলের জটিলতা ও ভোক্তা ভোগান্তি নিরসনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থা তদারকির জন্য নিয়োজিত ‘ট্যাগ অফিসারদের’ সুনির্দিষ্ট ১৩টি দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আজ গতকাল রোববার এক নির্দেশনায় এই দায়িত্বসমূহ স্পষ্ট করা হয়।
সরকার নির্ধারিত ট্যাগ অফিসারদের প্রধান দায়িত্বগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:- ট্যাগ অফিসারদের প্রতিদিন ফিলিং স্টেশনের প্রারম্ভিক ও সমাপনী মজুত রেকর্ড করতে হবে। ডিপো থেকে তেল আসার পর স্বশরীরে উপস্থিত থেকে পে-অর্ডার ও চালানের সাথে পরিমাপ মিলিয়ে তেল বুঝে নিতে হবে। এছাড়া ডিপ-রড বা ডিপ-স্টিকের মাধ্যমে সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রেজিস্টার খাতা মনিটর করা তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।
বিক্রয় ও মেশিন পরীক্ষা: প্রতিটি পাম্পের ডিসপেন্সিং মেশিনের দৈনিক মিটার রিডিং পর্যবেক্ষণ করে বিক্রির হিসাব মেলাতে হবে। মেশিন দিয়ে তেল দেওয়ার সময় পরিমাপ সঠিক থাকছে কি না, তাও নিয়মিত তদারকি করবেন এই কর্মকর্তারা। এছাড়া পাম্পের অনুমোদিত মজুত ক্ষমতার বাইরে কোনো অননুমোদিত ট্যাংক বা স্থাপনা আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখবেন তারা।
সরবরাহ ব্যবস্থা দৃশ্যমান করা: ডিপো থেকে পাম্প এবং পাম্প থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি পাম্পে দিনে অন্তত তিনবার (সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা) স্টকের তথ্য আপডেট করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও রিপোর্ট প্রদান:- ডিপো থেকে তেল নেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু করা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে প্রথমবার সতর্কতা, দ্বিতীয়বার মোবাইল কোর্ট এবং তৃতীয়বার লাইসেন্স সাময়িক স্থগিতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া পাম্প খোলা রাখা, সঠিক ক্যাশ মেমো প্রদান, কন্টেইনারে অবৈধ বিক্রি বন্ধ এবং দীর্ঘ সারি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ নিয়মিত রিপোর্ট করতে হবে।
মূলত জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধ এবং সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক মূল্যে তেল পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতেই সরকার এই কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছে।
জ্বালানি তেল আমদানি-সরবরাহে রাষ্ট্রীয় একক নিয়ন্ত্রণ বাতিল চেয়ে নোটিশ:
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘সংকট’ নিরসনে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির একক নিয়ন্ত্রণ বাতিল চেয়ে এ বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে জ্বালানি তেল মজুতদারি ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রো বাংলার আমদানির বিপরীতে বকেয়া ৩৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জনস্বার্থে গতকাল রোববার মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার এ নোটিশ পাঠান। ই-মেইল ও ডাকযোগে এ নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র সচিব, বিপিসি চেয়ারম্যান, যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ খনিজ, তেল ও গ্যাস করপোরেশনের (পেট্রো বাংলা) চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বিবাদী করা হয়েছে।