
এবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা ও কর্মস্থলে ফেরা ‘স্মুদ’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, ‘দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া যানজট বলেন, মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অথবা যানবাহনের অভাবে বাড়ি যেতে পারছেন না, ঈদের দিনও রাস্তায় কেটেছে- এরকম আগে ছিল। আমরা মনে করছি, যে কোনো সময়ের চেয়ে দেড় কোটি মানুষ নিরাপদে, স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করি। যদিও আমি বলছি যে, দু-তিনটি দুর্ঘটনা আমাদের ব্যথিত করেছে এবং আমাদের যেটা বলা হয় ভারাক্রান্ত করেছে।’
গতকাল রোববার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে দেশের সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, সড়কে সার্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সরকারের কার্যক্রম জোরদার করতে উচ্চপর্যায়ের সভা শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি করেন মন্ত্রী।
শেখ রবিউল আলম বলেন, “ঈদের জার্নি স্মুথ হয়েছে বলেই আমি মনে করি। কারণ দেড় কোটি মানুষ তিনদিনের মধ্যে ঢাকা ছাড়তে চেয়েছে, কোথাও কোনো বড় ধরনের দু-একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটার জন্য আমরা দুঃখিত, জাতি দুঃখিত, জাতি ভারাক্রান্ত, মর্মাহত। একটা প্রাণেরও ‘ডিপারচার’ কেউ চায় না।” দুর্ঘটনার জন্য আসলে দায়ী কারা-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, দুর্ঘটনার জন্য কাউকে বিশেষভাবে দায়ী আমি করতে চাই না। তবে এর সঙ্গে যাদের প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তদন্ত কমিটি করে তো এগুলো দেখতে হচ্ছে, যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছি, ডিপার্টমেন্টাল ব্যবস্থা— যে যেখানে আছে সেটা কিন্তু আমরা নিয়েছি।’
রবিউল আলম বলেন, ‘যেমন রেলের আপনি জানেন ওই দুজন গার্ডকে বহিষ্কার করা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের যে বস ছিল সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার যিনি ওখানে ওই গার্ডগুলো রাখা এবং তারা ফাংশন করছে কি না, উপস্থিত আছে কি না— এ যে অফিসারের দায়িত্ব ছিল, তাকেও আমরা চাকরিচ্যুত করে ব্যবস্থা নিয়েছি। অর্থাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রী নিয়ে পদ্মায় ডুবে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না হলে শুধু ওই বাসটি না, ওই কোম্পানির সব বাসের রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট বাতিল হয়ে যাবে। যদি তাকে যে কারণ দর্শানো অথবা তার কাছে যে জবাব চাওয়া হয়েছে তার সন্তোষজনক উত্তর না হয়। সেই প্রক্রিয়ায় আমরা চলে গিয়েছি।’ এসময় দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে বেসরকারি সংগঠনের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘নিহত নিয়ে যেটা বলেছেন, আমার মনে হয় যে আপনাদের পরিসংখ্যানের সাথে আমার দ্বিমত হবে। আমরা বিআরটিএ, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে অথরিটি সবকিছু মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তথ্য-উপাত্ত কালেক্ট করি। সেখানে এবার আপনার মৃত্যুর সংখ্যা হচ্ছে রোড দুর্ঘটনায়, সড়ক এবং নৌপথে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে— ১৭০ জন আমার কাছে। তার মধ্যে মহাসড়কে ৪৭ জন, ২৮ জন হচ্ছে নৌপথে, ১৭ জন সম্ভবত হচ্ছে রেলপথে।’ গত বছর ঈদের সময় ১১ দিনে দুর্ঘটনায় ১৮৭ জন মারা গেছেন বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমি এ পরিসংখ্যান দিয়ে তুলনা করতে চাচ্ছি না, কোনো মৃত্যুই কাম্য না— আমি প্রথমে বলেছি। তবে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি এ কথা বলা ঠিক হবে না, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আগের চেয়ে কম হয়েছে, আগামীতে আমরা আরও কম করব। সেই জন্যই কিন্তু আজকের এই প্রস্তুতি সভা, আজ আলোচনা সভা।’
অনিয়ম রোধে সব গণপরিবহনে বসবে জিপিএস ট্র্যাকার: একই অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, অনিয়ম রোধে সব গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানো হবে। মন্ত্রী বলেন, জিপিএস সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট। জিপিএস সিস্টেম আমরা চালু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সব পাবলিক পরিবহনে, সব পরিবহনে জিপিএস থাকবে। তাহলে দেখবেন যে নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি সম্ভব হবে, স্পিড নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, গাড়ির অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কে ট্রাফিক রুল মানছে না, নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কে মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে যাত্রী নিয়ে চলে যাচ্ছে, মানে টিকিট ছাড়াই যাত্রীদেরকে তুলে তাদের ইচ্ছামতো ভাড়া নিয়ে চলে যাচ্ছে গন্তব্যে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সব বাস বা কমার্শিয়াল পরিবহন, এগুলোতে জিপিএস ইনস্টল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই জিপিএস ইনস্টল করলে, জিপিএসের মাধ্যমে যারা ওভারস্পিড করবে, ৮০ কিলোমিটার বা ৬০ কিলোমিটার, এটার লিমিটের বাইরে যারা যারা যাবে, তাদের প্রত্যেকের রেকর্ড ফুটেজ আসবে আমাদের কাছে। সে অনুযায়ী তার জরিমানা চলে যাবে তার ঠিকানায়, যেই বাস বা যেই পরিবহন এটা অমান্য করবে।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, যারা রুট ভায়োলেট করবে, তারা অর্ধেক পথ থেকে ফিরে যাবে। অর্থাৎ, জিপিএসের মাধ্যমে জিও-ফেন্সিংসহ রুট যে এলাকায় যাওয়ার কথা, সেই এলাকার বাইরে গেলে বা রুট যদি ভায়োলেট করে, সেটা দিয়েও মামলা হবে।
মো. সরওয়ার বলেন, জিপিএসের মাধ্যমে আমরা এটাও করতে পারবো যে, আনফিট বাসগুলো রাস্তায় নেমেছে কিনা। কারণ, একটা বাসের ফিটনেস দুই বছর পর পর করতে হয়। ফিটনেস নিয়ে চালাতে হয়। এখন, আমাদের কাছে রেকর্ড আছে কারা কারা ফিটনেস নবায়ন করেনি। কিন্তু সে রাস্তায় না নামলে আমরা কিন্তু তাকে জরিমানা করতে পারি না। জরিমানা করলে বলে যে, আমি তো চালাইনি, আমি তো ফিটনেসের জন্য ওয়েট করছি। কিন্তু সে রাস্তায় নামালে ওই ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
জিপিএস কি শুধু মহাসড়কে চলাচল করা গাড়িতে বসবে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিপিএস সব গাড়ির জন্য। ধরেন একটা গাড়ি ঢাকার ভিতরে ঢোকার কথা না, সে গাবতলী পর্যন্ত থাকবে, এখন সে চলে আসলো এখানে কলাবাগান পর্যন্ত বা এদিকে আরামবাগ পর্যন্ত। ওই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হবে।
কবে নাগাদ এটা বাস্তবায়ন হবে—জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, এটা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় গণপরিবহনে জিপিএস চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বলেও জানানো হয়।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠত আজকের সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।