ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

‘সুশাসন নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই’

‘সুশাসন নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, ‘সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই। প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা না থাকলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট এবং অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি অডিটরিয়ামে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রিজভী বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে ঐক্য ধরে রাখতে পারলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ১৭৫৭ সাল থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে বারবার দমনের চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই মানুষ সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে দীর্ঘ বঞ্চনা, প্রতিরোধ এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।’ এ প্রসঙ্গে ভিয়েতনামের ইতিহাসের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একটি জাতি কিভাবে দীর্ঘ বিদেশি শাসন ও দখলদারির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, ভিয়েতনাম তার অনন্য দৃষ্টান্ত।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নানা সময়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। কখনো এটিকে শুধু ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়, অথচ প্রকৃত সত্য হলো—এটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের যুদ্ধ।’

তিনি বলেন, ‘কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআরসহ সর্বস্তরের মানুষ এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের ভেতর থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা উঠে এসেছিলেন।’

ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার সব অবদান একটি পরিবার বা একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে উপস্থাপন করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা জাতির আত্মাকে কলুষিত করেছে।

তরুণ প্রজন্মের প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ‘স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তাদের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তবে তরুণেরা এখন সত্য বুঝতে পারছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। তার ভাষায়, তারুণ্যের ধর্মই হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।’

স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেলেই একটি জাতি পূর্ণ স্বাধীন হয় না। নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের মূল চেতনা হচ্ছে মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। যদি একটি দল বা একজন নেতার কণ্ঠস্বরই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটি গণতন্ত্র নয়।’

প্রশাসনের নিরপেক্ষতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই ডিসি আমাদের লোক কি না, ওই বিভাগীয় কমিশনার কোন রাজনৈতিক দলের—এভাবে বিচার করতে গেলে বিভাজন চরমে পৌঁছাবে, আর শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র—দুটোরই অধঃপতন হবে।’

রিজভী বলেন, ‘প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে মেধা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সুশাসন না থাকলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, জনগণের অর্থ লুটপাট হয়, তা বিদেশে পাচার হয় এবং তখন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ফেইলড স্টেট বলার সুযোগও তৈরি হয়।’

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।’

ইতিহাস রচনার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ‘যার যেখানে অবদান, সেই অবদানের স্বীকৃতি দিয়েই দেশের ইতিহাস রচনা করতে হবে। ইতিহাসকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে বিভ্রান্তি ও বিভাজন কমবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এ দেশের মানুষের যুদ্ধ, পাকিস্তানি শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই। ভারতের সহযোগিতা ছিল, তবে যুদ্ধটি মূলত বাংলাদেশের মানুষেরই।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত