
ফুলকপি মানেই শীতকাল- এমন ধারণা এখন বদলে দিচ্ছেন দিনাজপুরের কৃষকরা। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এবার গ্রীষ্মকালেও সফলভাবে ফুলকপি চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছেন চাষিরা। মৌসুমের বাইরে উৎপাদিত এই সবজিতে মিলছে ভালো দাম, তাই লাভবান হচ্ছেন কৃষকরাও।
দিনাজপুর সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের উত্তর মহেশপুর গ্রামের কৃষক ওবায়দুল ইসলাম এবার গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। খরিপ-১ মৌসুমে মাত্র ৩০ শতক জমিতে ‘আইসবল’ জাতের প্রায় ৫ হাজার ফুলকপির চারা রোপণ করেন তিনি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচর্যার ফলে মাত্র ৬০ দিনের মধ্যেই তার জমি ভরে ওঠে সাদা ফুলকপিতে। বর্তমানে খেত থেকেই পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে ফুলকপি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ টাকার ফুলকপি বিক্রির আশা করছেন তিনি।
কৃষক ওবায়দুল ইসলাম জানান, মার্চ মাসের শেষ দিকে জমি প্রস্তুত করে কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি ফুলকপির চারা রোপণ করেন। খেতে ফেরোমন ফাঁদ, আঠা ফাঁদ ও লাইট ট্র্যাপ ব্যবহার করে নিরাপদ উপায়ে পোকামাকড় দমন করা হয়েছে। পাশাপাশি জৈব সার ও পরিমিত বালাইনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে সবজির গুণগত মান বজায় রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মাত্র দুই মাসের মধ্যেই ফুলকপি বাজারজাত করা সম্ভব হয়েছে। ৩০ শতক জমিতে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি। বাজারে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে হারভেস্টিং শুরু করেছি। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করব।’ ওবায়দুল ইসলামের সফলতা দেখে আশপাশের কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। প্রতিবেশী কৃষক বিদ্যুৎ রহমান বলেন, ‘গরমের সময় ফুলকপি চাষ সম্ভব- এটা আগে কল্পনাও করিনি। ওবায়দুল ইসলামের খেতের ফলন দেখে আমিও অনুপ্রাণিত হয়েছি। আগামী বছর অন্তত ১ একর জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষের পরিকল্পনা করছি।’
একই গ্রামের কৃষক মহেন্দ্রনাথ বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষে উঁচু জমি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা থেকে ফসল রক্ষা করতে হয়। আমি গত বছর ২০ শতক জমিতে এই ফুলকপি চাষ করে ভালো লাভ পেয়েছিলাম। এবারও চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
আরেক কৃষক আব্দুস সামাদ বলেন, ‘অন্যান্য সবজির দাম কমে গেলেও গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির বাজারমূল্য ভালো থাকে। ফলে কৃষকরা দ্রুত লাভবান হতে পারেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা আরও বাড়লে এই চাষ সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়বে।’
দিনাজপুর সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু বোরহান বলেন, ‘টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, চারা, সার ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি এখন দিনাজপুর অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অল্প সময়ে অধিক লাভ পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। একইসঙ্গে ভোক্তারাও মৌসুমের বাইরে তাজা ফুলকপি পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন।’
দিনাজপুর অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির চাষ পরিচিত করা হয়। শুরুতে কৃষকরা সীমিত আকারে এক থেকে দুই বিঘা জমিতে এই চাষ করলেও মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। যদিও এ মৌসুমে অতিবৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির মতো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার পরও কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন ও পরিচর্যার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে দিন দিন এই চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।