
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশক ধরে অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করছে ‘খ্রিস্টান জায়নবাদ’। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ তরুণ রক্ষণশীল ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিকভাবে এই আন্দোলন এখনও শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এর ভিত্তিমূলে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টান জায়নবাদীরা বিশ্বাস করেন, যিশু খ্রিস্টের দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের জন্য সমস্ত ইহুদিদের ফিলিস্তিনে পুনর্বাসন এবং সেখানে ইসরায়েল রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়া ধর্মীয়ভাবে আবশ্যক। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য-উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে (বাইবেল বেল্ট) কোটি কোটি অনুসারী তৈরি হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকান পার্টির প্রধান ভোটব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতির প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আসছে। এর আগে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পেছনেও এই গোষ্ঠীর ধর্মতাত্ত্বিক সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছিল।
তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে মার্কিন তরুণ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কট্টর বামপন্থী সাময়িকী ‘জ্যাকোবিন’ তাদের এক প্রতিবেদনে খ্রিস্টান জায়নবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
জরিপ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এক দশক আগে যেখানে প্রায় ৬৫ শতাংশ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ‘প্রি-মিলেনিয়ালিজম’ বা যিশুর পুনরাগমনের তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, ২০২১ সালের এক জরিপে দেখা গেছে অনুর্ধ্ব-৩০ বছর বয়সি ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে এই হার মাত্র ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। তরুণদের মাত্র ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ সরাসরি ইসরাইলকে সমর্থন করছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাসের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা। আধুনিক তরুণ ইভানজেলিক্যালরা ইসরাইলকে ধর্মীয় কোনো পবিত্র ভূমি হিসেবে দেখার চেয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়নকারী রাষ্ট্র হিসেবে বেশি দেখছেন। পিউ রিসার্চ এবং ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, তরুণ রিপাবলিকানদের বড় অংশই এখন মনে করে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত।
অবশ্য জনসমর্থন কমলেও ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারণী মহলে খ্রিস্টান জায়নবাদীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক প্রভাব এখনও ম্লান হয়নি। ‘খ্রিস্টানস ইউনাইটেড ফর ইসরাইল’-এর মতো লবিস্ট সংগঠনগুলো প্রতি বছর লাখ লাখ ডলার খরচ করছে ইসরাইলের জন্য বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোর করতে।
আল জাজিরার এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসরাইলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত শীর্ষ ৩৬টি মার্কিন খ্রিস্টান সংগঠনের সম্মিলিত বার্ষিক আয় প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা আমেরিকার মূলধারার যেকোনো বড় বাণিজ্যিক লবিং গ্রুপের চেয়েও অনেক বেশি। অধ্যাপক মেলানি ম্যাকঅ্যালিস্টার জানান, এই সংগঠনগুলোর মূল শক্তি শুধু লবিং নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষমতা।
তরুণদের এই বিমুখতা মার্কিন ও ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। তরুণ রক্ষণশীলদের সংগঠক চার্লি কার্ক মৃত্যুর আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লেখা এক চিঠিতে সতর্ক করেছিলেন, ইসরায়েল তথ্যযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল সরকার আমেরিকার চার্চগুলোতে প্রোপাগান্ডা চালাতে এবং তরুণদের আকৃষ্ট করতে যাজকদের বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া শুরু করেছে। এমনকি সম্প্রতি ইসরায়েলি নেসেট (সংসদ) প্রাক-ইসরাইল জনসংযোগের জন্য রেকর্ড ৭৩০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে।
ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল হামেল বলেন, খ্রিস্টান জায়নবাদ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। তরুণ প্রজন্ম এখন ইসরাইলকে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর চশমা দিয়ে না দেখে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন যাজক ফারেস আব্রাহাম আল জাজিরাকে বলেন, খ্রিস্টান জায়নবাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো কৌশলগত পরাজয় নয়, বরং এর নৈতিক অবক্ষয়। তারা যে ভঙ্গুর ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ ও রক্তপাতকে সমর্থন করছে, তা খোদ খ্রিস্টধর্মের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। আগামী দিনের মার্কিন রাজনীতিতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।