
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো মতিঝিলে অবস্থান নিয়েছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে এ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনকারীরা খুরশীদ আলমের পাশাপাশি গভর্নর মোস্তাকুর রহমানেরও পদত্যাগ চাইছেন। সাড়ে ৯টার দিকে মাইকে বক্তব্য শুরু করেন গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা। এসময় সেখানে নানা স্লোগান দেওয়া হয়। দিলকুশা এলাকা ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রয়েছে জলকামান, পুলিশের সাঁজোয়া যান ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য।
খুরশীদ আলমকে এস আলম গ্রুপের সহযোগী আখ্যা দিয়ে তাকে সরানোর দাবি জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলছেন, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের দখলে যাওয়ার আগে যারা পর্ষদে ছিলেন, তাদেরকেই পরিচালনায় ফেরাতে হবে। গত ২৪ মে চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করার পর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সেদিনই খুরশীদ আলমকে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় সোমবার সকালে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে মতিঝিলের দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল ব্যক্তি। তারা ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহালেও দাবিও তোলেন। জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত প্লাটফর্মটির সদস্যদের সেদিন সকাল ১০টার আগ দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছোড়ার পাশাপাশি জলকামান ব্যবহার করেন। পরে আন্দোলনকারীরা ফের অবস্থান নেন।
এই আন্দোলনের কারণে সেদিন দুপুরে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের পূর্বনির্ধারিত পর্ষদ সভা অনলাইনে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে আন্দোলনকারীদের বাধায় তা হয়নি। পরে রাতে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল সভায় অংশ নেন খুরশীদ আলম এবং চার স্বতন্ত্র পরিচালক। তবে সেই সভায় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) আলতাফ হুসাইন ও কোম্পানি সচিব হাবিবুর রহমান অংশ নেননি।
তারা অংশ না নেওয়ায় সভাটি পরিচালনা পর্ষদের সভা (বোর্ড মিটিং) হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে খুরশীদ আলম বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি ভারপ্রাপ্ত এমডি ও কোম্পানি সেক্রেটারিকে সভায় আনতে। কিন্তু তাদের রিচ করা যায়নি। শুনেছি তাদের বোর্ড মিটিংয়ে অংশ নিতে আপত্তি দিয়ে রেখেছে গ্রাহকরা, যারা দিনে আন্দোলন করেছে।’
সভায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইনকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ ৭ দাবি, আন্দোলনকারীদের সংবাদ সম্মেলন : ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবিতে আজ দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকটির ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ সদস্যরা। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ইসলামী ব্যাংকের সামনে সংবাদ সম্মেলন থেকে ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন ফোরাম নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে দাবিগুলো তুলে ধরেন ফোরামের আহ্বায়ক নুর-উন-নবী।
দাবিগুলো কী
সংবাদ সম্মেলনে সচেতন গ্রাহক ফোরাম ৭ দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলো হলো : ১. ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ করা চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে পদত্যাগ করতে হবে। ২. ওমর ফারুক খানকে এমডি পদে পুনর্বহাল করতে হবে। ৩. লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কেউ ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডে থাকতে পারবে না। ৪. ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্ট থেকে ১৮(ক) ধারা বাতিল করতে হবে। ৫. এস আলমের দখল করা মালিকানা এবং দেশে থাকা তার সম্পত্তি বিক্রি করে লুট করা অর্থের সমন্বয় করতে হবে। ৬. শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, এস আলম যাতে কোনো ব্যাংকেই ফিরতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ৭. ইসলামী ব্যাংকসহ সব ব্যাংক লুটকারীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন। সেদিন রাত নয়টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে এই পদে নিয়োগ দেয়। খুরশীদ আলম আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
এদিকে আজকের সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের রাজনৈতিক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সচেতন গ্রাহক ফোরামের নেতারা। গত সোমবার আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যরা ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অস্থিরতা ছড়াচ্ছেন। সড়কে আন্দোলন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আসবে না। আন্দোলনকারীরা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বশীল পদে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা গ্রাহক। গ্রাহক পরিচয়েই এখানে দাবি নিয়ে এসেছি।’
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে চট্টগ্রামেও মানববন্ধন : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে অপসারণের দাবিতে চট্টগ্রামেও মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে নগরের আগ্রাবাদে ইসলামী ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এর ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা ব্যবস্থা এবং গ্রাহকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে অপসারণ করা প্রয়োজন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বক্তারা বলেন, ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। তাদের দাবি, ব্যাংকের স্বার্থ এবং আমানতকারীদের প্রত্যাশার কথা বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
আন্দোলনকারীরা আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। এ লক্ষ্যে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করেন। কর্মসূচিতে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এর নেতা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গ্রাহক অংশ নেন। তবে এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নয়, তার স্ত্রী ঋণখেলাপি -বাংলাদেশ ব্যাংক : ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম ঋণখেলাপি- এমন অভিযোগ নিয়ে চলা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দাবি, খুরশীদ আলম নিজে ঋণখেলাপি নন; তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণ খেলাপি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিক খুরশীদ আলমের স্ত্রী। ওই ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়েছে। ফলে খুরশীদ আলমকে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা সঠিক নয়। তার স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি হলেও খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন।
খুরশীদ আলমকে ঘিরে সম্প্রতি আরেকটি পুরোনো অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কৌশলে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ একটি অফিস আদেশ জারি করে।
ওই আদেশে বলা হয়, ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস-২০০৩-এর ৪৪(১)(বি) ধারা অনুযায়ী তার দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বন্ধ করা হয়।
তবে দীর্ঘ আট বছর পর ওই ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আরিফ হোসেন খান বলেন, সে সময় খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে তাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তা যথাযথ ছিল না। এ কারণেই পরে তিনি নির্বাহী পরিচালক এবং ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পদোন্নতি পান।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগ প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক। কোনো ধরনের আন্দোলন বা চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না। তিনি বলেন, আজ যদি কোনো পক্ষের আন্দোলনের কারণে একটি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরেকটি পক্ষ আরও বড় আন্দোলন করে অন্য সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি তুলবে। এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে পারে না।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনলাইন সভার অনুমতি প্রসঙ্গে আরিফ হোসেন খান বলেন, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে ভার্চুয়াল সভা আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অনুমতি দিয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে অনলাইনে পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং এতে কোনো বিধিনিষেধ নেই।
উল্লেখ্য, খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেবল ইনক্রিমেন্ট বন্ধের মতো শাস্তি দেওয়ায় সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছিল। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তার নিয়োগের পর পুরোনো অভিযোগগুলো আবারও সামনে এসেছে।
ঋণখেলাপির অভিযোগ এবং অতীতের শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই খুরশীদ আলমকে নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তার বিরুদ্ধে প্রচারিত ঋণখেলাপির তথ্য সঠিক নয় এবং এ বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন।