ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

মাছের জন্য বিখ্যাত ঘুঘরার বিল ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

মাছের জন্য বিখ্যাত ঘুঘরার বিল ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

কোথাও দিগন্তজোড়া জলরাশি, কোথাও আবার সেই জলের বুকেই খেলা করছে লাখো মাছের চঞ্চলতা। পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের সোনাঝরা আলো যখন এই জলরাশিতে এসে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। বলছিলাম চাঁদপুরের কচুয়া কুমিল্লার চান্দিনা ও দাউদকান্দির সীমানাঘেঁষে অবস্থিত কুমিল্লার চান্দিনার ঐতিহ্যবাহী ঘুঘরার বিলের কথা। একসময়ের অনাবাদী, অবহেলিত এই জলাভূমি আজ শুধু এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিই নয়, বরং হাজারো মানুষের মনের খোরাক জোগানো এক অপরূপ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি উদাসীনতায় বিলটি এখনো পূর্ণাঙ্গ আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ডানা মেলতে পারেনি। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ঘুঘরার বিল মানেই ছিল এক বিশাল অথৈ জলের দিগন্ত। বছরের পর বছর ধরে এখানে শুধু পানি আর পানি থৈ থৈ করত। ফসলের নাম করে সারা বছরে মাত্র একটি ফসল ঘরে তুলতে পারতেন স্থানীয় কৃষকরা। বছরের বাকিটা সময় এই বিশাল জমি অলস পড়ে থাকত, যা থেকে মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘোরার কোনো সুযোগই ছিল না। কিন্তু সময়ের আবর্তনে মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসে। সাহসী ও দূরদর্শী কিছু মাছ চাষির হাত ধরে এই বিলের বুকে সূচিত হয় এক নীরব বিপ্লব। জমির মালিকদের কাছ থেকে লিজ বা ভাড়া নিয়ে তারা এখানে গড়ে তোলেন একের পর এক মৎস্য খামার।

আজ সেই ঘুঘরার বিল দেশের অন্যতম বড় মৎস্যভাণ্ডার। প্রতিবছর এই বিলের খামারগুলো থেকে কোটি কোটি টাকার মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জোগান দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এই রূপালী বিপ্লব শুধু যে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে তা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে রাখছে এক বিশাল ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। যে বিল একসময় ছিল অনুৎপাদনশীল, আজ তা প্রতি নিয়ত কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রবাহ সচল রাখছে। তবে ঘুঘরার বিলের গল্পটা শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের নয়, এটি এখন এক নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে এই বিলটি যেন এক নতুন রূপের সাজে সেজে ওঠে। চারদিকের স্বচ্ছ জলরাশি আর গ্রামীণ প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ শহুরে যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত মানুষকে এক নিমিষেই এনে দেয় মানসিক প্রশান্তি। কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই এই বিলটি সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে এক প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন বিকেল হতেই হাজার হাজার মানুষ তাদের পরিবার, প্রিয়জন আর ভালোবাসা নিয়ে ছুটে আসেন এখানে। কেউ নৌকায় চড়ে বিলের বুকে ঘুরে বেড়ান, কেউ বা পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য। দর্শনার্থীদের এই উপচে পড়া ভিড় দেখে স্থানীয় কিছু উদ্যোক্তা নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করেছেন নান্দনিক সব স্পট। জলের ওপর তৈরি করা মাচা, বসার সুব্যবস্থা আর ছোট ছোট বিনোদন কেন্দ্রগুলো আগত পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি এই স্পটগুলো বিলের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসার বিপরীতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। বিভিন্ন সময়ে সরকারের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই ঘুঘরার বিল পরিদর্শন করেছেন। তারা বিলের অপার সম্ভাবনা দেখে এটিকে একটি আধুনিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বারবার আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেইসব আশ্বাস আজ পর্যন্ত শুধু কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। সরকারি কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়। উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং নিরাপত্তার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রকৃতির টানে মানুষ এখানে ছুটে আসে। ঘুঘরার বিলকে যদি পরিকল্পিত ও সরকারিভাবে একটি আধুনিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করা যায়, তবে এটি হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। আধুনিক রাইড, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট তৈরি করা গেলে এখান থেকে সরকারের পক্ষে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে মৎস্য চাষ ও পর্যটন, এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ঘুঘরার বিল হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম একটি মডেল অর্থনৈতিক অঞ্চল। আর কত আশ্বাস দিলে আলোর মুখ দেখবে এই বিল, এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। সরকারি সুদৃষ্টিই পারে ঘুঘরার বিলের এই সুপ্ত সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দিতে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত