
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সবজিখ্যাত গ্রাম দূর্গাপুর ও ছাতিয়ান গ্রামের পান্তিক কৃষক পরিবারগুলো বসত ঘরের চালে কিংবা বাড়ির আঙিনার সামান্য পড়ে থাকা পতিত জমিতে মাচা পদ্ধতিতে চালকুমড়া চাষ করে স্বালম্বি হচ্ছে। বাজারে ক্রেতাদের কাছে পুষ্টিগুনে সমৃদ্ধ হিসেবে অতি উত্তম সবজি চালকুমড়ার খ্যাতি রয়েছে সে অনেক কাল ধরেই। বিশেষ করে ইলিশ মাছ দিয়ে রান্না চালকুমড়ার তরকারীর স্বাদ আজো বাঙালির মুখে লেগে আছে, আগামীতেও এই স্বাদ থাকবে চিরন্তন বাঙালির হৃদয়ে।
চালকুমড়া গ্রাম বাংলায় ঘরের চালেই বেশি ফলানো হয়। হয়তো এই কারণেই এটি চালকুমড়া নামে পরিচিত। তবে জমিতে (মাচায়)-এর ফলন বেশি হয়। কচি কুমড়া (জালি) তরকারী হিসেবে এবং পরিপক্ক কুমড়া মোরব্বা ও হালুয়া তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুমড়োবড়ি তৈরির মুল উপাদানই হচ্ছে এই চালকুমড়া। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সবজিখ্যাত গ্রাম দূর্গাপুর ও ছাতিয়ান গ্রামের অনেক কৃষক বিভিন্ন সবজির পাশাপাশি বসত ঘরের চালে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনার সামান্য পড়ে থাকা পতিত জমিতে মাচা পদ্ধতিতে চালকুমড়া চাষ করে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের দূর্গাপুরও ছাতিয়ান এলাকার প্রান্তিক বসির উদ্দিন মিরপুর উপজেলা ও জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতমানের চালমুকড়া চাষের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
বসির উদ্দিন জানান, প্রশিক্ষণে লব্ধ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রথমে নিজের এবং পরে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে বিগত চার বছর ধরে চালমুকড়া চাষ করছি। প্রথম বছরেই এ চাষে সাফল্য পেয়েছি। টানা-টানির অভাবের সংসারে আমার সুখের সন্ধান দিয়েছে এই চালকুমড়ার আবাদ। সংসারে ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা। সংসার চালিয়েও দুই মেয়ে ও এক ছেলের লেখা-পড়ার খরচ যোগাচ্ছেন তিনি এই সবজি আবাদ থেকেই। বর্তমানে হাটবাজারে প্রতি পিচ চালকুমড়া ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করছে। অনেক পাইকারি ব্যবসায়ীও তার খেত থেকে চালকুমড়া কিনে নিয়ে অনত্র বিক্রি করছে। আবার চাষের শেষের দিকে কুমড়োবড়ির জন্য পাকানো হয় চালকুমড়া। যা শীতের শুরুতেই বাজার উঠে। প্রতিটি পাকা চালকুমড়া একশত টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে।
শুরু থেকে আজোবধি এ চালকুমড়া চাষে বাম্পার ফলন হওয়ায় এবং বাজারে এর চাহিদা ভালো থাকায় বসির দম্পত্তির মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। বসির উদ্দিনের চালকুমড়া চাষের সফলতা দেখে মিরপুর উপজেলার সবজিখ্যাত গ্রামগুলোর পল্টু ফকিরসহ অনেক কৃষক চালকুমড়া চাষের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং তারা ছোট পরিসরে হলেও চালকুমড়া চাষ শুরু করেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে চালকুমড়ার কোনো অনুমোদিত জাত নেই।
তবে বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত বারি চালকুমড়া-১ নামের জাতটি বাংলাদেশের সব অঞ্চলে চাষ করা যায়। এছাড়াও রয়েছে হাইব্রীড চালকুমড়া সুফলা-১, হাইব্রীড চালকুমড়া বাসন্তী-নিরালা, হাইব্রীড চালকুমড়া বিজয় (উফশী-বিজয়),হাইব্রীড চালকুমড়া সোনালী এফ-১, হাইব্রীড চালকুমড়া মাধবী, হাইব্রীড চালকুমড়া ইউনিক, হাইব্রীড চালকুমড়া সুপারস্টার।
কৃষি বিভাগ আরও জানায়, ফলের মাছি পোকা, রেড পামকিন বিটল, ইপিল্যাকনা বিটল, লাল মাকড় প্রভৃতি পোকা ফলের ক্ষতি করে থাকে। কীটনাশক প্রয়োগ করে এসব পোকা দমন করা যায়। এছাড়া পাউডারি মিলডিও পাতার উপরে সাদা পাউডার এবং ডাউনি মিলডিউ পাতার নিচে ধূসর বেগুনি রং প্রভৃতি রোগ পাতার ক্ষতি করে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। ছত্রাক নাশক বা বোর্দো মিক্সার প্রয়োগ করে এসব রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ভাল ফলন পেতে গাছের গোড়ার মাটি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। বর্ষার পানি জমলে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছের বৃদ্ধির জন্য মাচা দিতে হবে। গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি উঠিয়ে দিতে হবে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক সুফি রফিকুজ্জামান বলেন, চিলমারী চরের সফল প্রান্তিক কৃষক জমির শিকদারের মতো এ জেলার অনেক প্রান্তিক কৃষক চালকুমড়া সহ বিভিন্ন সবজি চাষে স্বচ্ছলতা ফিরে পেয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের মাঝে সবজি বীজ বিতরণ করা হয় এবং এ সবজি চাষে পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।