
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ও বিদেশে কাঁঠালের জন্য প্রসিদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের কাপাসিয়া। সবুজ শ্যামল গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। কাপাসিয়ার কাঁঠাল শুধু বাংলাদেশের চাহিদাই পূরণ করেনা বিদেশে ও রপ্তানী হয়। এ জন্যই কাপাসিয়াকে কাঁঠালের রাজধানী বলা হয়। এবার কাঁঠালের বিশাল একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি হবে বলে ধারণা দিয়েছে ঢাকা থেকে কাপাসিয়া কাঁঠাল কিনতে আসা পাইকাররা। কাপাসিয়ার কাঁঠাল শুধু দেখতে খুবই সুন্দর, খেতেও সুমিষ্ট ও সুস্বাদু।
বাংলাদেশের কাঁঠাল উৎপাদনের অন্যতম স্থান হচ্ছে গাজীপুরের কাপাসিয়া। বাংলাদেশের কাঁঠালের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তার বেশিরভাগ পূরণ করে থাকে কাপাসিয়ার কাঁঠাল। কাঁঠাল চাষে তেমন একটা পরিশ্রম করতে হয় না। উঁচু মাটিতে একবার একটি কাঁঠালের চারা রোপন করলে ৪-৫ বছর থেকে শুরু করে কমপক্ষে ৭০-৮০ বছর অনায়াসে ফলন পাওয়া যায়। কাপাসিয়ার কাঁঠালে কোনো প্রকার ক্যামিকেল মিশানো হয় না বলে ভিটামিন অক্ষুণ্ণ থাকে। কাঁঠাল কাঠ আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। কাঁঠাল দিয়ে সু-স্বাদু পিঠা তৈরি করা হয়। এ এলাকার কৃষানিরা কাঁঠালের মৌসুমে প্রতি বাড়িতেই কাঁঠালের পিঠা তৈরি করে থাকে। কাঁঠালের মৌসুম এলেই কাঁঠালের রসের মতো কৃষকদের মনে হাসি ফোটে ওঠে। কাঁঠালের মৌসুমে কাপাসিয়ার প্রতি ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বইতে থাকে। এ সময়টির জন্য উপজেলার কৃষক-কৃষানিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। কাপাসিয়ায় এমন কোন গ্রাম নেই, যেখানে কাঁঠাল বাগান নেই বা কাঁঠাল চাষ হয় না। উপজেলার সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদন হয়, এমন স্থানগুলো হলো বারিষাব, খিরাটী, খোদাদিয়া, বরুন, কান্দানিয়া, চাঁদপুর, কামড়া মাশক, ঘাটকুড়ি, রাওনাট, ভূবনেরচালা, জামিরারচর, সূর্য্যনারায়নপুর, পাবুর, রাউৎকোনা, কাজাহাজী, চাকৈল, বড়জোনা, বড়চালা, দূর্গাপুর, তরগাঁও, নবীপুর, বাঘিয়া, মৈশন, উত্তরখামের, সোনারুয়া, পিরিজপুর, বেগুনহাটি, কড়িহাতা, কাপাসিয়া, সিংহশ্রী, রায়েদ, দরদরিয়া, চৌরাপাড়া, বড়হর, বাগেরহাট, ভুলেশ্বর, বেলাশী, কপালেশ্বর, গিয়াসপুর, বারাব, উজলী, কির্ত্তুনিয়া, গাওরার, ভেরারচালা, সোহাগপুর, টোক, সনমানিয়া, ঘাগটিয়া, নলগাঁও, তিলশুনিয়া, বর্জাপুর, বাঘুয়া, সিংগুয়া, কামারগাঁও, ঘোষেরকান্দি, গোসাইরগাঁও, নরোত্তমপুর, ফুলবাড়ীয়া, দক্ষিণখামের, চরখামের, কুশদী, রায়েদ, ড়িবাড়ী, নামিলা, আড়ালিয়া, সাফাইশ্রী এলাকায়। কাপাসিয়ার কাঁঠাল দেখতে খুবই সুন্দর ও আকারে ভালো।
এরই মধ্যে উপজেলার গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন পাইকারদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। পাইকাররা উপজেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁঠাল ও কাঁঠাল বাগান কিনছেন। একটি কাঁঠাল গাছে ৫০ থেকে দুই শতাধিক কাঁঠাল ধরে। মৌসুমের শুরুতে প্রকারভেদে একটি কাঁঠালের দাম ৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা ছিল কিন্তু বর্তমানে তা ৩০ থেকে ১০০ অধিক। তাই মৌসুমের সুরুতে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি রয়েছে।
কাপাসিয়া উপজেলা রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে ঐতিহ্যবাহী শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে ৩৫৭ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নের ও সকল গ্রামের সর্বত্রই রয়েছে ছোট-বড় কাঁঠাল বাগান। কাঁঠাল উৎপাদনের জন্য কাপাসিয়ার মাটি উৎকৃষ্ট। কাপাসিয়ার কাঁঠাল বাগান দেখলে ও কাপাসিয়ার সুমিষ্ট কাঁঠাল খেলে মনে হয়, এই মাটিতে যেন সৃষ্টিকর্তার অশেষ নেয়ামত রয়েছে।
জমজমাট হয়ে জমে উঠছে কাপাসিয়ার সবগুলো ছোটবড় কাঁঠাল বাজার তারমধ্যে কাপাসিয়া, টোক, বারিষাব, সিংহশ্রী, রায়েদ, তরগাঁও, ঘাগটিয়া, সনমানিয়া, কড়িহাতা, দূর্গাপুর, চাঁদপুর তারাগঞ্জ, রাণীগঞ্জ, গিয়াসপুর, ত্রিমোহনী, আড়াল, খিরাটি, আমরাইদ, রাওনাট, বলখেলা, নারায়নপুর অন্যতম। কাঁঠাল বাজারের দিকে তাকালে মনে হয় যেন উৎসব শুরু হয়েছে। যে ব্যাক্তি কাপাসিয়ার কাঁঠালের স্বাদ উপভোগ করেন নাই, তার জীবনটাই অপুর্ণ। কাপাসিয়ায় ভোর বেলা থেকে শুরু হয় কাঁঠাল বিক্রি, রাত পর্যন্ত তা বিক্রি চলে।
কাঠাল বিক্রি করতে আসা, নজরুল ও মোমেন মিয়া জানায়, এবারের ভালো কাঁঠালের ফলনে আমরা খুশি দাম এখন একটু কম পাচ্ছি কিন্তু মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেয়েছি। ভরা মৌসুমে আমরা কখনোই ভালো দাম পাই না কারণ এ ফলটি দ্রুত পচনশীল। সরকার যদি ভরা মৌসুমে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাহলে সবসময়ই আমরা ন্যায্য মূল্য পেতাম।
কাঁঠাল কিনতে আসা পাইকার মজনু মিয়া, সাহাব উদ্দিন, আবুল হাসেম, মোহাম্মদ আলী জানান, বাজারে জায়গার অভাবে বেশি কাঁঠাল কিনে রাখতে পারি না। তাই আমরা বেশি কাঁঠাল কিনি না। তবে কাপাসিয়ার কাঁঠাল অত্যন্ত সুস্বাধু এবং জনপ্রিয় তাই আমরা ভালো লাভ করতে পারি।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আউলিয়া খাতুন জানায়, কাঁঠাল অত্যন্ত সুমিষ্ট সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর একটি ফল। কাপাশিয়ার কাঁঠাল শুধু বাংলাদেশে বিখ্যাত নয়, আমার জানা মতে বিশ্ব বিখ্যাত। কাপাসিয়ার কাঁঠাল বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কাঁঠাল দ্রুত পচনশীল হওয়ায় কাঁঠাল ও অন্যান্য ফল সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কাঁঠালের মৌসুম শুরুর পূর্ব থেকেই আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কাপাসিয়া, গাজীপুর এর সকল কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ে কর্মরত আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাবৃন্দ কাঁঠাল চাষিদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং পরামর্শ প্রদান করে আসছে।