
সুদভিত্তিক অর্থনীতির বদলে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালুর দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। রাজশাহী-১ আসনের এই এমপি বলেছেন, সুদ ছাড়াও অর্থনীতি চলতে পারে। বাংলাদেশে সুদভিত্তিক অর্থনীতির ‘কবর রচনা’ করতে হবে। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংসদ সদস্য মুজিবুর বলেন, ‘মদিনার ইসলাম হলে সুদকে বন্ধ করতে হবে। মদিনার বাজেটে জাকাত ছিল। জাকাত চালু করতে হবে।’
জাতীয় বাজেটে ‘জাকাত’ শব্দ না থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী ৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন, কিন্তু জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির কথা নেই।
মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের লোক। ওখানে তো কোরআন হাদিস পড়ার একটা কালচার আছে বলে আমি জানি।
‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝে মাঝে আয়াত যখন পড়েন, তখন মনে হয় যে কালচার তিনি করেছেন। আমাদের অর্থমন্ত্রী দেখলাম না- জাকাত শব্দ এখানে উচ্চারণ করেছেন।’
ঋণনির্ভরতা নিয়েও আপত্তি জানান জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। ঋণ করা সুযোগ আছে, তবে ঋণী অবস্থায় মরে যাওয়াটা আল্লাহ পছন্দ করেন নাই। ঋণ পরিশোধ করে মরতে হবে।
জাতীয় ঋণকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ঋণ করা যাবে; কিন্তু ঋণ রেখে মারা যাওয়া যাবে না।’
ঋণ করে রাষ্ট্র চালানোর সমালোচনা করে মুজিবুর বলেন, ‘ফকিরি করে দেশ চালানো যাবে না। আমাদের নিজের সম্পদকে সংগ্রহ করে আমাদের সম্পদ দিয়ে দেশ চালাতে হবে। ঋণ করে ঘি খাওয়ার মত পরিকল্পনা করলে এটা আমাদের জাতি এবং দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমি মনে করি। সুদ ছাড়াও অর্থনীতি চলতে পারে দাবি করে তিনি ইসলামী ব্যাংকের প্রসঙ্গ টানেন সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান।
‘ইসলামী ব্যাংক যখন ঠিকমত চলছিল, বড় বড় সুদি ব্যাংক বাংলাদেশে ছিল। তারা যখন দেখল, এই সুদি কারবার চলছে না; তখন প্রত্যেকটা ব্যাংক- তারা ইসলামিক কাউন্টার খুলেছিল। এটা প্রমাণ করে, বাংলাদেশে সুদ ছাড়াই অর্থনীতি চলতে পারে।‘
জাকাত আদায়ের জন্য আলেমদের নিয়ে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে হানাফি আলেম আছে, আহলে হাদিসের আলেম আছেন। আরও অনেক মাসায়েলের লোক আছে। আলেমদের নিয়ে একটা কমিটি করেন।’ তিনি বলেন, ‘এই জাকাত দিয়ে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি বাংলাদেশে চালু করতে হবে। সুদভিত্তিক অর্থনীতির কবর রচনা করতে হবে।’ বাংলাদেশে আলাদা জাকাত মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবও দেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, ‘আমি দাবি করব বাংলাদেশেও একটা জাকাত মিনিস্ট্রি চালু করে বাংলাদেশের শরীয়তভিত্তিক জাকাত কালেকশন করা এবং সেভাবেই বণ্টন করা।’
ঠিকমতো জাকাত আদায় করা গেলে বছরে ২ লাখ কোটি টাকা আসতে পারে দাবি করে মুজিবুর বলেন, ‘এখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে- যদি ঠিকমত জাকাত আদায় করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে ২ লাখ কোটি টাকা জাকাত বের হইতে পারে। আমাদের যে ঘাটতি বাজেট- এ জাকাত দিয়ে পূরণ হইতে পারে।’ কালো টাকা সাদা করার সুযোগেরও বিরোধিতা করেন মুজিবুর।
তিনি বলেন, ‘কালো টাকা মানে হারাম টাকা। হারাম টাকা ঘুষ দিয়ে কি হালাল করা যাবে? কখনোই যাবে না।’
কালো টাকা বৈধ করার বিধান থাকলে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই ধারাটা বন্ধ করতে হবে যে, কালো টাকাকে সাদা করা যাবে না। এটা যদি চালু থাকে অন্যায় বলে কোন জিনিস বাংলাদেশে আর থাকবে না সব ন্যায় হয়ে যাবে।’ বাজেটে মদ ও বিড়ির ওপর শুল্ক বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেন তিনি।
বিএনপির সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মুজিবুর বলেন, ‘তিনি কালকে বললেন যে, বিড়ির দামটা একটু কমাইলে ভালো হতো। স্পিকার, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিড়ি যাতে না খায়, নেশাদব্য যাতে না খায়, মদ যাতে মানুষ না খায়- সেজন্যই তো দাম বেশি করেছে। এজন্য তাকে ধন্যবাদ আমরা জানাই।’ কওমি মাদ্রাসার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবিও জানান জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসায় কোরআন হাদিস শেখানো হয়। আপনার সন্তানকে যদি আমরা বা আপনি আমরা দিতে পারি, কোরআন হাদিসের বড় আলেম হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। অতএব এই কওমি মাদ্রাসার প্রতি অর্থমন্ত্রীর কোনো বাজেট থাকা দরকার।’
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য পোশাক, জুতা ও ব্যাগ দেওয়ার কর্মসূচির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধার মধ্যে আছে কি না, তা দেখা দরকার। ‘আমি দাবি করছি মাদ্রাসার ছাত্রদেরও যাতে পায়ে জুতা থাকে, তাদের শরীরে জামা থাকে; তাদেরও দেখতে ভালো লাগবে।’ শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবিও সংসদে তোলেন মুজিবুর।
তিনি বলেন, ‘আজকে প্রেস ক্লাবে যেখানে সেখানে তার অধিকার আদায়ের জন্য যখন তারা আন্দোলন করে, অবস্থান করে, তখন তাদের প্রতি কি আমাদের দায়ী দায়িত্ব নাই। স্পিকার অবশ্যই তাদের প্রতি দায়িত্ব আমাদের আছে।’
তিন ধাপে এমপিওভুক্তির প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান সব শর্ত পূরণ করেছে, বাজেট বাস্তবায়ন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর এমপিও দেওয়া উচিত। যেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু ঘাটতি আছে, তাদের সময় দেওয়া যেতে পারে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির কথাও বলেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকার আগে তার মজুরি দিয়ে দিতে হবে। আজ পর্যন্ত ঘাম শুকিয়ে কোথায় চলে গেছে তাদের বেতন এখনো পরিশোধ হচ্ছে না।’
সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে মুজিবুর বলেন, জনগণকে শুধু প্রণোদনা না দিয়ে কাজ দিতে হবে। ‘জনগণের হাতে কাজ দিন। জনগণ কার্ড চায় না; কাজ চাই। এই জাতিকে দারিদ্রতা থেকে মুক্ত করতে চাই।’
রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোরের সংসদ সদস্য বলেন, যদি আমরা কাউকে দান করি, কাউকে যদি আমরা কোনো প্রণোদনা দিই- কিছুদিনের জন্য তার উপকার হবে।
‘এটা যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন আবার তার সে ভিক্ষার হাতই থাকবে; কিন্তু যদি কাজ দিই, তাহলে কিন্তু এই জাতি গড়ে উঠবে।’