
২০১৪ সাল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের মুখোমুখি হন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের সুনগর গ্রামের খাদিজা বেগম। হঠাৎ করেই স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার সাগরে ভাসতে হয় তাকে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি না থাকায় নেমে আসে চরম অর্থনৈতিক সংকট। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নতুন করে ভাবতে হয়েছে কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে গড়ে তুলবেন তাদের ভবিষ্যৎ।
অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো থেমে যাবে তার জীবনসংগ্রাম। কিন্তু তিনি হার মানেননি। চোখের জলকে শক্তিতে, কষ্টকে প্রেরণায় আর স্বপ্নকে সাহসে রূপ দিয়ে শুরু করেন এক নতুন পথচলা।
সেই পথচলার নাম কৃষি। তবে প্রচলিত কৃষি নয়, একেবারে ভিন্নধর্মী কৃষি। যখন উত্তরাঞ্চলের মানুষ ধান, ভুট্টা, গম কিংবা আলুর চাষে অভ্যস্ত, তখন খাদিজা বেগম সাহস করে শুরু করেন কফি, রাম্বুটান ও ড্রাগনের মতো বিদেশি ও উচ্চমূল্যের ফলের চাষ। অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কেউ বলেছেন, এই মাটিতে কফি হবে না। কেউ বলেছেন, বিদেশি ফলের চাষ করে লাভ নেই। কিন্তু তিনি মানুষের কথায় কান না দিয়ে নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গেছেন।
আজ সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তিন বিঘার বেশি জমিজুড়ে গড়ে উঠেছে তার কফি বাগান। এর পাশাপাশি রয়েছে রাম্বুটান, ড্রাগন, মাল্টা, কমলা, বারোমাসি আম, লেবুসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফলের বাগান। একসময়ের ছোট্ট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে একটি অনুকরণীয় কৃষি খামারে, যা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীরা আসছেন।
বাগানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি সবুজ কফি গাছ। কোথাও ফল ধরেছে, কোথাও নতুন ফুলের সমারোহ। পাশেই লাল রঙের থোকায় থোকায় ঝুলছে রাম্বুটান। অন্যদিকে ড্রাগনের বাগানও দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পুরো খামারজুড়ে যেন পরিশ্রম, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার এক অপূর্ব সমন্বয়।
খাদিজা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি অনেক অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। দুই ছেলেকে মানুষ করার দায়িত্ব ছিল আমার কাঁধে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, কারও কাছে হাত পাতব না। নিজের পরিশ্রমেই সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ব। শুরুতে অনেক কষ্ট হয়েছে, অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস হারাইনি। আজ আল্লাহর রহমতে মানুষ আমার বাগান দেখতে আসে, আমার কাছ থেকে পরামর্শ নেয়। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তিনি আরও বলেন, কৃষিকে যদি আধুনিকভাবে করা যায়, তাহলে অল্প জমি থেকেও ভালো আয় সম্ভব। আমি চাই আমাদের দেশের নারীরা ঘরে বসে না থেকে কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুক। কৃষিই হতে পারে আত্মনির্ভরতার অন্যতম পথ।
খাদিজা বেগমের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রম। প্রতিটি গাছের পরিচর্যা তিনি নিজেই করেন। নতুন কোনো জাতের ফল চাষের আগে তথ্য সংগ্রহ করেন, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেন এবং প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে অনুসরণ করেন। তার বিশ্বাস, কৃষিতে সফল হতে হলে শুধু শ্রম নয়, জ্ঞান ও পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে তার বাগান শুধু একটি উৎপাদনকেন্দ্র নয়, এটি একটি শিক্ষাকেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা এখানে এসে কফি, রাম্বুটান ও ড্রাগন চাষের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। অনেকেই তার পরামর্শ নিয়ে নিজ এলাকায় বিদেশি ফলের চাষ শুরু করেছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগও তার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। উচ্চমূল্যের ফলের চাষ কৃষকদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খাদিজা বেগম সেই সম্ভাবনারই একটি সফল উদাহরণ।
তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এরইমধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং জনপ্রতিনিধিরা তার বাগান পরিদর্শন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার কফি, রাম্বুটান ও ড্রাগনের বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।