
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জর্ডানে ইরানের আকস্মিক ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ২ সদস্য নিহত হয়েছেন এবং ১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, হামলায় আহত আরও ৪ মার্কিন সেনাকে উদ্ধার করে জর্ডানের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের এই ভয়াবহ আঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে গত শনিবার রাতে ইরানের ওপর টানা অষ্টম দিনের মতো বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই নতুন সংঘাতের ফলে চলমান যুদ্ধে মার্কিন নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা নিহতদের পরিচয় বা ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান প্রকাশ না করলেও সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ইরানের হুমকি নস্যাৎ করতে এবং জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার দ্রুত জবাব দিতেই এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
মাত্র এক মাস আগে শুরু হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বৈরিতা চরম রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ইতিমধ্যেই ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবারও কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে, যার জবাবে ইরানও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানিসংকটের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে।
এদিকে, এই হামলার পর শনিবার রাতে এক লিখিত বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেছেন। যুদ্ধে তার বাবা নিহত হওয়ার পর এই প্রথম দেওয়া এক বিবৃতিতে খামেনি বলেন, ওয়াশিংটনের বারবার চুক্তি লঙ্ঘন প্রমাণ করেছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের কাছে এমন শিক্ষা রয়েছে যা তারা কখনো ভুলবে না। অন্যদিকে, জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশসীমায় অন্তত ১০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, যার ফলে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকানদের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ইরান যদি আলোচনায় ফিরে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে বোমাবর্ষণ করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন ইরানি নাগরিক নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং যেকোনো মুহূর্তে এই সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ইরানের নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্কিন হামলা : তেহরান ও ওয়াশিংটনের মাঝে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববার ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা (এইওআই) এক বিবৃতিতে পারমাণবিক বিদুৎকেন্দ্রে মার্কিন হামলার এই তথ্য জানিয়েছে।ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অত্যন্ত বর্বর ও আগ্রাসী এক পদক্ষেপের মাধ্যমে রোববার নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে মার্কিন বাহিনী।
দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থা বলেছে, খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এই বিষয়ে জানতে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে।সংস্থাটি বলছে, স্থানীয় সময় রোববার ভোর ৩টা ৩৯ মিনিটের দিকে ওই পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এইওআই। ইরানে ২০২২ সালে ওই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির সামরিক-বেসামরিক স্থাপনার লক্ষ্য করে গত এক সপ্তাহ ধরে টানা হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলার জবাবে কয়েকটি আঞ্চলিক দেশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহার করা সব স্থাপনা ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনীও।
যুদ্ধের অবসান এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মাঝে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে তেহরানের বাধা দেওয়ার অভিযোগে দেশটিতে নতুন করে হামলা শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি ইরানের : ইরাক সীমান্ত সংলগ্ন খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহরের আকাশে মার্কিন একটি ‘এমকিউ-৯’ ড্রোন গুলি করে নামানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আকাশসীমা লঙ্ঘনের দায়ে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি তেহরানের। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর তথ্য অনুসারে, এমকিউ-৯ রিপার একটি উন্নত দূরনিয়ন্ত্রিত চালকবিহীন বিমান। এটি মূলত গোয়েন্দা সংগ্রহ, নজরদারি এবং লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ব্যবহার হয়।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইরান। এসব হামলার পর কুয়েত ও বাহরাইনে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের আগ্রাসনের পর তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোদমে সক্রিয় করেছে। শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, যেকোনো বিস্ফোরণের শব্দ আসলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাজের ফল।
ইরানের সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিংয়ের গোলাবারুদের ডিপো এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির প্রতিরক্ষা রাডার সিস্টেমে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
একইসঙ্গে উপসাগরীয় প্রতিবেশী বাহরাইনেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে দেশটিতে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থাকতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
‘ইরানে নেই মোজতবা খামেনি’, দাবি সৌদি সংবাদমাধ্যমের : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে নিজ দেশে ইরানে নেই বলে দাবি করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আল-হাদাথ। একটি ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত বার্তাগুলো, তার কোনোটিই তিনি নিজে লিখছেন না। ওইসব বার্তা লিখছেন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নতুন প্রধান আহমাদ ওয়াহিদি ও বাহিনীর অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। যাতে দেশে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি কৃত্রিম আবহ তৈরি করা যায়। তবে তিনি বর্তমানে ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গার নাম বা প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি প্রতিবেদনে। সূত্র আরও জানিয়েছে, ‘ইরানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরম আকার নিয়েছে। এই ফাটল এতটাই গভীর যে, তা আইআরজিসির অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।’
বর্তমান সংঘাত নিয়ে ইসরায়েলি সূত্রটি বলেছে, চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়ও, তারপরও যুক্তরাষ্ট্র চায় ইসরায়েল যেন ইরানে কোনো পাল্টা হামলা না চালায়’।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে অতর্কিত হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনী। সেই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ তার পরিবারের অনেকে নিহত হয়। সেইদিন অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন মোজতবা।
এরপর গত ৮ মার্চ ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন মোজতবা। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দীর্ঘ ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি কেবল লিখিত বিবৃতি দিচ্ছেন, জনসমক্ষে আসেননি বা এখন পর্যন্ত তার বর্তমান কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং প্রকাশিত হয়নি। এমনকি বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় ও জানাজাতেও মোজতবাকে দেখা যায়নি। এতে তার অবস্থান, শারীরিক অবস্থা এবং শাসন করার ক্ষমতা এখনও অনেকাংশেই একটি রহস্য হয়ে রয়েছে।
এরআগে মার্চ মাসে কিছু পশ্চিমা ও কুয়েতি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় মোজতবাকে চিকিৎসার জন্য গোপনে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছে এবং দেশটির রাজধানী মস্কোতে চিকিসৎসা চলছে।
তবে পরবর্তীতে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবর অস্বীকার করা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মোজতবার মস্কোতে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। খামেনির শারীরিক অবস্থা ভালো আছে বলেই উল্লেখ করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ধারণা করা হচ্ছে হামলায় খামেনির মুখমণ্ডল বিকৃত হয়েছে। সেই সঙ্গে তার একটি পা বা উভয় পা-ই গুরুতর আঘাত লেগেছে। একটি সূত্র বলছে খামেনি একটি পা হারিয়েছেন। তবে সর্বোচ্চ নেতার আঘাতের মাত্রা নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়নি ইরান সরকার।