
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার একটি বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। দুই একর জমির চারপাশজুড়ে সারি সারি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে বাদামি রঙের ছোট ছোট ফল। দূর থেকে অনেকটা লিচুর মতো মনে হলেও এটি লিচু নয়- ভিনদেশি ফল লংগান। জেলায় প্রথম বাণিজ্যিক লংগান বাগান গড়ে তুলে আলোচনায় এসেছেন চিরিরবন্দর উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের জোতকৃষ্টাই গ্রামের উদ্যোক্তা মাওলানা মনিরুজ্জামান রিফাত।
বাগান ঘুরে দেখা যায়, প্রায় দুই একর জমির চারপাশে অর্ধ শতাধিক লংগান গাছ। প্রতিটি গাছেই থোকায় থোকায় ফল ধরেছে। এখানে মূলত ভিয়েতনামের দুটি জাত পিংকন ও পিংপং চাষ করা হয়েছে। দেশে নতুন ও উচ্চমূল্যের ফল হিসেবে লংগানের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। কৃষি বিভাগের মতে, উপযুক্ত পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে এই ফলের বাণিজ্যিক চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
লংগান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল। চীনে বহু শতাব্দী ধরে এর চাষ হয়ে আসছে। এছাড়া মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামেও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয় এই ফল। বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে এর চাষ হলেও দিনাজপুরে এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফলন এসেছে।
উদ্যোক্তা মনিরুজ্জামান জানান, দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি করেছেন তিনি। সেখানেই প্রথম লংগান ফলের সঙ্গে পরিচয়। তিনি বলেন, ‘আবুধাবিতে প্রায়ই ফলের ঝুড়িতে লংগান দেখতাম। স্থানীয়রা খুবই আগ্রহ নিয়ে এই ফল খেত। আমিও খেয়েছি। তখন থেকেই এই ফলের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। দেশে ফিরে ২০২২ সালে চুয়াডাঙ্গার কামরুজ্জামান নামের এক ব্যাক্তির নার্সারি থেকে ৫০টি চারা প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা দামে কিনি। পরে আরও ৭৫টি চারা সংগ্রহ করি। নিজস্ব দুই একর জমিতে পোলট্রি খামারের করার পাশাপাশি খামারের চারপাশে এসব গাছ লাগিয়েছি। মাত্র চার থেকে পাঁচ বছরের পরিচর্যায় এখন প্রতিটি গাছ ফল দিচ্ছে।
মনিরুজ্জামান আরও জানান, গত বছর প্রায় পাঁচ লাখ টাকার লংগান বিক্রি করেছেন। এবার যে পরিমাণ ফল এসেছে, তাতে অন্তত ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন। তার এই লংগানের বাগান দেখে আশপাশের অনেক কৃষক ও পাশের জেলার উদ্যোক্তারাও আগ্রহী হয়েছেন। এরইমধ্যে অনেকেই তার কাছ থেকে চারা কিনেছেন। যদিও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারার কথা বলেন মনিরুজ্জামান।
চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা বলেন, চিরিরবন্দরে এটিই প্রথম বাণিজ্যিক লংগান বাগান। দেশে বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি গাছ দেখা গেলেও এত বড় পরিসরে ফলন এবারই প্রথম আমাদের নজরে এসেছে। চার থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় সব গাছেই ফল এসেছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তিনি জানান, লংগান, লিচু ও রামবুটান একই উদ্ভিদ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। লংগান অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু একটি ফল। সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে বাজারে আসে যখন লিচুর মৌসুম শেষ হয়ে যায়। এখানে যে ভিয়েতনামি পিংপং জাতের লংগান চাষ করা হয়েছে, তাতে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম। ফলে খুব কম কীটনাশক ব্যবহার করেই নিরাপদভাবে ফল উৎপাদন সম্ভব।