
সাতক্ষীরায় তিনটি হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করে দায়িত্ব অবহেলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। হাসপাতালগুলো হলো- জেলার তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল। গতকাল রোববার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত টানা এই তিনটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এসময় তিনি হাসপাতালগুলোর সেবার মান, চিকিৎসকদের উপস্থিতি, হাসপাতালের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শন শেষে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসি চুরির ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এক নিরাপত্তাকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত দুই চিকিৎসককে বরখাস্তের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এছাড়া শ্যামনগরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক মেধাবী তরুণীকে চাকরির আশ্বাসও দেন। সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন- তালা উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. শাওলী নানজিবা তন্নি, নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা বিশ্বাস, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সোহানা সেলিম। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম।
এদিন সকালে প্রথমে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে মন্ত্রী হাসপাতালের রান্নাঘর, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড, ওষুধের স্টোর, অপারেশন থিয়েটার (ওটি), চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের হাজিরা খাতা, ওয়াশরুম ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তিনি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ সরবরাহ এবং হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন। পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারি সম্পদ রক্ষায় কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। সম্প্রতি হাসপাতালের এসি চুরির ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত মেডিকেল অফিসার ডা. শাওলী নানজিবা তন্নিকে বরখাস্ত করে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের চলমান সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করারও নির্দেশ দেন। বিশেষ করে ওয়াশরুমের সংস্কার ও অন্যান্য উন্নয়নকাজ নিয়মিত তদারকির কথা বলেন।
পরে দুপুর ২টার দিকে তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কলেজ ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন। প্রায় এক ঘণ্টা বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসাসেবার খোঁজ নেন। এসময় দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় চিকিৎসক সোহানা সেলিমকে বরখাস্ত করেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনো কম। দীর্ঘদিন চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তারপরও সীমিত জনবল নিয়ে এখানকার চিকিৎসকেরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের রান্নাঘর, বাথরুম, চিকিৎসকদের উপস্থিতি সবকিছু দেখেছি। দুজন চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তালা হাসপাতালে চুরির ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতালগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক। তবে উপস্থিতি ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আরও কঠোর হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘রোস্টার ডিউটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। অনেক সময় চিকিৎসকেরা হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর করেন না। এসব বিষয়ে শৃঙ্খলা আনতে হবে। বিশেষ করে নার্সদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়। দেশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে নার্সদের উপস্থিতি কম। বিষয়টি দ্রুত ঠিক করতে হবে।’
চিকিৎসক সংকট নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসক সংকট কাটাতে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।’ তিনি জানান, তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের মাটি পরীক্ষার (সয়েল টেস্ট) কাজ শুরু হবে। সেখানে ৭ থেকে ৮ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। নতুন ভবনে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্যারালাইসিস সেন্টার, ফিজিওথেরাপি সেন্টার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা হবে। এরপর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সেবার মান সম্পর্কে খোঁজ নেন।