ঢাকা শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার

পরিবেশে মানুষের বা অন্য প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী, অতিরিক্ত, বিরক্তিকর এবং ক্ষতিকর উচ্চ শব্দ সৃষ্টি হওয়াই হলো শব্দদূষণ। সাধারণত ৪৫ থেকে ৬৫ ডেসিবেলের বেশি তীব্র শব্দ মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, যা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। তাছাড়া অত্যধিক জোরালো শব্দ শ্রবণকোষ ধ্বংস করতে পারে, যার ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। একে বলা হয় শব্দণ্ডপ্ররোচিত শ্রবণশক্তি হ্রাস। বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা অত্যধিক শব্দ পাই- যেমন কারখানার যন্ত্রপাতি, ভবনের নির্মাণস্থল, উচ্চ শব্দযুক্ত সরঞ্জামের ব্যবহার। এ ছাড়া আছে বিনোদনমূলক উৎস, যেমন শুটিং, ডিসকো ও ব্যক্তিগত স্টেরিওর ব্যবহার। গাড়ির হর্নও একটি বড় কারণ। বেশি শব্দদূষণ হয় বিমানবন্দর ও ট্রাফিক পয়েন্টের মতো জায়গাগুলোয়।

তাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। আবাসিক এলাকায় রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো নিষিদ্ধসহ উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে একাধিক বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শব্দদূষণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ কারণে সরকার ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’ জারি করেছে এবং সবাইকে তা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্প এলাকায় সর্বোচ্চ ৮০ ডেসিবেল এবং মিশ্র এলাকায় সর্বোচ্চ ৭৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ করা যাবে না।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী কোনো যন্ত্রপাতি বা কর্মকাণ্ডে নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রম করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া পারিবারিক অনুষ্ঠান বা জনসমাবেশে উচ্চ শব্দের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না। অনুমতি থাকলেও শব্দের মাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি এবং সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করা যাবে না।

নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রমকারী হর্ন উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিক্রয়, প্রদর্শন, বিপণন, পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া আতশবাজিসহ কোনো ধরনের শব্দদূষণ করা যাবে না। আবাসিক এলাকায় রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ।

প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে লাউডস্পিকার বা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে এমন যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা যাবে না। ট্রাফিক সার্জেন্ট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সামনে শব্দদূষণের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে বিধিমালা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

শব্দদূষণ মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

মানুষ ও প্রাণিজগতের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপের ওপর শব্দের বিস্তৃত প্রভাব শব্দদূষণ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাপী শব্দের বহিরাগত দূষণ মূলত যন্ত্রপাতি, পরিবহন এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে ঘটে। দুর্বল নগর পরিকল্পনা শব্দদূষণকে বাড়িয়ে তুলতে পারে, পাশাপাশি শিল্প-কারখানার ভবনগুলো আবাসিক অঞ্চলে শব্দদূষণের কারণ হতে পারে। আবাসিক অঞ্চলে শব্দের মূল উৎসগুলোর মধ্যে উচ্চ আওয়াজের সংগীত, পরিবহন ট্র্যাফিক, রেল, বিমান ইত্যাদি, নির্মাণকাজ, বৈদ্যুতিক জেনারেটর এবং লোকজনের কোলাহল অন্তর্ভুক্ত। মানুষের বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী কোনো শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যানজট, কল-কারখানা থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী তীব্র শব্দের উৎপত্তি হয়। মানুষ সাধারণত ২০-২০,০০০ হার্জের কম বা বেশি শব্দ শুনতে পায় না। তাই মানুষের জন্য শব্দদূষণ প্রকৃতপক্ষে এই সীমার মধ্যেই তীব্রতর শব্দ দ্বারাই হয়ে থাকে। শব্দ মূলত ডেসিবেলে (ডিবি) মাপা হয়। বহু উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যুৎ জেনারেটর শব্দদূষণ সংক্রান্ত পরিবেশগত অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, আবাসিক অঞ্চলে গড় শব্দের মান ৯৭ ডেসিবেল, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত গড় আওয়াজ স্তরমান ৫০ ডেসিবেলের অনেক ঊর্ধ্বে। গবেষণা থেকে জানা যায় যে, স্বল্প আয়ের এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এলাকাগুলোতে শব্দদূষণ সর্বাধিক। উচ্চশব্দের মাত্রা মানুষের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার প্রাব এবং করোনারি আর্টারি ডিজিজ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। প্রাণীদের মধ্যে শব্দদূষণ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে, প্রজনন এবং নেভিগেশনে প্রভাব ফেলতে পারে এবং স্থায়ীভাবে শ্রবণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন করতে পারে। মানুষের কান যেকোনো শব্দের ব্যাপারে যথেষ্ট সংবেদী। তাই তীব্র শব্দ কানের পর্দাতে বেশ জোরে ধাক্কা দেয়, যা কানের পর্দাকে নষ্টও করে দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। শিশু বয়সে শব্দের অধিক তারতম্যের জন্য বৃদ্ধ বয়সে তাদের কানের বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। দলগতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে শব্দদূষণের কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে এবং দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে দূষণের মাত্রা বেশি, সেখানে নিম্নলিখিত অসুবিধা বা ক্ষতিকর প্রভাব মানুষের মধ্যে পড়েছে : (ক) দূষণ প্রভাবিত এলাকার মানুষের মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে (খ) আচরণে অস্বাভাবিকতা ও মানসিক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে (গ) মানুষকে ক্লান্ত, মানসিক অবসাদগ্রস্ত ও কাজে অমনোযোগী করে তুলছে (ঘ) বয়স্ক মানুষের স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে এবং (ঙ) এমনকি বধির হওয়ার মতো খবর পাওয়া যাচ্ছে।

শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য এবং আচার-আচরণ উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে। অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত শব্দের কারণে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক কার্যকলাপ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শব্দদূষণের কারণে দুশ্চিন্তা, উগ্রতা, উচ্চরক্তচাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস, ঘুমের ব্যাঘাতসহ অন্যান্য ক্ষতিকর ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। এছাড়াও অন্যান্য শারীরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক অবসাদ ইত্যাদি হতে পারে। বিমানের প্রচণ্ড আওয়াজের ফলে বিমানবন্দর এলাকার আশপাশে ব্যাপক শব্দদূষণগত পরিবেশের সৃষ্টি করে।

রাতে এবং ভোরে যদি বিমান পরিচালনা করা হয়, তখন ব্যক্তির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শুধু অবতরণ কিংবা উড্ডয়নের জন্যই বিমানের আওয়াজ সৃষ্টি হয় না, পাশাপাশি বিমান মেরামত, পর্যবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের জন্যও এরূপ হয়ে থাকে। এর ফলে ব্যক্তি বিশেষত শিশুর শব্দদূষণগত কারণে শারীরিক এবং মানসিক বিকাশেও ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। বয়স্কদের শব্দের কারণে কার্ডিয়াকজনিত সমস্যা হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং শব্দদূষণ শিশুদের ওপর যে প্রভাব ফেলে, তা স্থায়ী হতে পারে।

কোলাহল শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং শিশুর পড়াশোনা এবং আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শব্দদূষণ স্বাস্থ্য এবং আচরণ উভয়কেই প্রভাবিত করে। অযাচিত শব্দ শারীরবৃত্তীয় স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। শব্দ যখন ঘুম বা কথোপকথনের মতো স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপে হস্তক্ষেপ করে বা কারো জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে বা হ্রাস করে তখন অযাচিত হয়ে ওঠে। ৮৫ ডেসিবেলের ওপরে শব্দের মাত্রাগুলোর দীর্ঘায়িত এক্সপোজারের কারণে শ্রবণ ক্ষমতার ক্ষতি হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে শব্দের এক্সপোজার শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। শব্দের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস বিশ্বব্যাপী কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সাধারণ রোগ।

শব্দের দূষণ প্রতিবন্ধী, প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) বা শব্দের প্রতি অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা হতে পারে। এএসডি আক্রান্ত লোকেরা জোরে শব্দের সঙ্গে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে অস্বস্তিকর শারীরিক সংবেদন পায়। যার ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয় এবং তাদের জীবনযাত্রাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। হঠাৎ উচ্চ আওয়াজ যেমন গাড়ির অ্যালার্ম এএসডি আক্রান্ত লোককে প্রভাবিত করতে পারে।

কোলাহল প্রাণীর ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে, শিকারি বা শিকার শনাক্তকরণ এবং এড়ানোর ক্ষেত্রে ভারসাম্য পরিবর্তন করে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই প্রভাবগুলো পরোক্ষ প্রভাবের মাধ্যমে কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও মিথস্ক্রিয়াকে পরিবর্তন করতে পারে। মানুষের ক্রিয়াকলাপের কারণে সমুদ্রের মধ্যে শব্দদূষণ হয়। প্রোপেলার এবং ডিজেল ইঞ্জিনগুলোর কারণে কার্গোজাহাজগুলো উচ্চস্তরের শব্দ উৎপন্ন করে। এই শব্দদূষণ বাতাসের কারণে সৃষ্ট নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সি পরিবেষ্টনের শব্দস্তরকে উল্লেখযোগ্যভাবে উত্থাপন করে। যোগাযোগের জন্য শব্দের ওপর নির্ভরশীল সামুদ্রিক প্রাণীরা বিভিন্নভাবে এই আওয়াজ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। উচ্চ পরিবেষ্টিত শব্দস্তর প্রাণীদের আরো উচ্চৈঃস্বরে শব্দ সৃষ্টি করতে বাধ্য করে, যাকে লোম্বার্ড প্রভাব বলা হয়।

গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে, লো ফ্রিকোয়েন্সি সোনারের কারণে হ্যাম্পব্যাক তিমির শব্দের দৈর্ঘ্য দীর্ঘ হয়। তারা দেখেন শব্দদূষণের ফলে সামরিক সোনারের উচ্চ আওয়াজের সংস্পর্শে আসার পরে কয়েকটি প্রজাতির তিমির মৃত্যু হয়েছে। এমনকি সামুদ্রিক ইনভারটেবরেটস, যেমন কাঁকড়ার জাহাজের আওয়াজ দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে দেখা গেছে। বড় কাঁকড়াগুলো ছোট কাঁকড়ার চেয়ে শব্দ দ্বারা আরো বেশি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত বলে চিহ্নিত হয়েছে। অ্যানথ্রোপোজেনিক শব্দের সংস্পর্শে আসার ফলে হাইপারসেনসিটিভিটি সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত