ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় সবুজ পানে লাভের হাসি

চান্দিনায় সবুজ পানে লাভের হাসি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে গেলে চোখে পড়বে বাঁশ, শন আর সুপারি গাছের চটা দিয়ে তৈরি সারি সারি ঘেরা ঘর। বাইরে থেকে হুট করে দেখলে মনে হতে পারে কোনো রহস্যময় আস্তানা, কিন্তু ভেতর ঢুকতেই চোখে পড়ে এক নজরকাড়া সবুজ পরিবেশ। মাটির বুঁকে ডালপালা মেলে বেয়ে উঠছে কচি পানের লতা। পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে যত্ন আর অভিজ্ঞতার ছাপ। শুধু একটি ফসল হিসেবে নয়, চান্দিনার মাটি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্কের সঙ্গে মিশে আছে পান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বংশানুক্রমে এই অঞ্চলের কৃষকরা ধরে রেখেছেন পান চাষের ঐতিহ্য।

উপজেলার কাদুটি, বরকামতা, মহিচাইল, আলীকামোড়া, পাইকের করতলা, চাঁদসার ও লনাই গ্রামগুলোতে ঢুকলেই বোঝা যায় এখানকার অর্থনীতির চালিকাশক্তি কী। প্রতিটি গ্রামেই যেন সবুজ পানের বরজের রাজত্ব। ঘরের আঙিনা থেকে শুরু করে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, সবখানেই ফুটে ওঠে পানের সতেজতা। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো মহালনী, চালতাগোটা ও সাচি জাতের পান। চমৎকার স্বাদ, স্থায়িত্ব এবং বিশেষ সুবাসের কারণে চান্দিনার পানের আলাদা কদর রয়েছে দেশজুড়ে। দূর-দূরান্তের ব্যাপারীরা হাটের দিনে চান্দিনায় ভিড় জমায় শুধু এই বিখ্যাত পান সংগ্রহ করতে।

পান চাষ শুধু কৃষিকাজ নয়, এটি এক ধরনের নিপুণ শিল্প। প্রখর রোদ, অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত থেকে পানের লতাকে রক্ষা করতে দিনরাত পরিশ্রম করেন চাষিরা। পানের বরজ তৈরি করা থেকে শুরু করে লতা বাঁধানো, মাটি তৈরি, জৈব সার দেওয়া এবং নিবিড় পরিচর্যা, সবকিছুতেই প্রয়োজন হয় অগাধ ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা। একজন চাষির সজাগ দৃষ্টি আর পরম মমতায় একেকটি বরজ হয়ে ওঠে সবুজ প্রাচুর্যের প্রতীক। শত বছর ধরে চলে আসা এই অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার বহন করছেন চান্দিনার বর্তমান প্রজন্মের কৃষকরাও। বর্তমানে এই পানের ভালো দাম মেলায় চান্দিনার চাষিদের মুখে ফুটেছে তৃপ্তির হাসি। বাজারে এক ভিরা (সাধারণত পানের একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ) ভালো মানের সাচি বা চালতাগোটা খিলিপান বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এমনকি সাধারণ মানের পানও ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে। পানের এই চড়া দাম স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য বড় বড় শহরের পাইকারি বাজারগুলোতেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। ফলে অন্যান্য ফসলের তুলনায় পান চাষে লাভের মুখ দেখছেন কৃষকরা অনেক বেশি।

এই লাভজনক পরিস্থিতি চান্দিনার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন হাওয়া এনে দিয়েছে। পান বিক্রি করে উপজেলার বহু কৃষক আজ স্বাবলম্বী। যে পরিবারগুলো একসময় অভাব-অনটনের সঙ্গে দিন পার করত, তারা এখন পান চাষের বদৌলতে সন্তানদের পড়াশোনা পড়াচ্ছেন, পাকা ঘরবাড়ি তুলছেন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করছেন। অনেক কৃষক তাদের পরিবারের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন এই এক পানের বরজের ওপর ভর করে।

কৃষকদের এই সফলতা দেখে চান্দিনায় এখন নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। পুরনো চাষিদের পাশাপাশি অনেক অনভিজ্ঞ ও তরুণ উদ্যোক্তারাও এখন পান চাষের দিকে ঝুঁকিচ্ছেন। যাদের একখণ্ড উপযুক্ত জমি আছে, তারা নতুন করে বরজ বানানোর পরিকল্পনা করছেন। স্থানীয় প্রবীণ চাষিরাও নতুনদের পরম আগ্রহে শিখিয়ে দিচ্ছেন পানের বরজ তৈরি ও পরিচর্যার নানাবিধ নিয়ম। এতে করে চান্দিনার পানের বরজের সংখ্যা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ঐতিহ্যটি নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

তবে সফলতার সুন্দর গল্পের পেছনে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। পান বেশ সংবেদনশীল একটি ফসল। হঠাৎ কোনো রোগের আক্রমণ বা আবহাওয়ার বৈরী আচরণ নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে বছরের পুরো সঞ্চয়। তার ওপর বরজ তৈরির জন্য ব্যবহৃত বাঁশ, শন, তার এবং সারের দাম আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে। স্থানীয় পান চাষিদের মতে, যদি তারা সময়মতো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়া পান এবং সরকারি পর্যায় থেকে সুলভ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়, তবে চান্দিনার পান চাষ আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে।

সমস্যা যাই থাকুক না কেন, চান্দিনার মানুষের মনোবল আর ভালোবাসার কাছে তা যেন ফিকে হয়ে যায়। শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য শুধু টিকে নেই, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। ঐতিহ্য, কঠোর পরিশ্রম আর ভালো দামের মেলবন্ধনে চান্দিনার পান চাষ আজ এক আশাজাগানিয়া সম্ভাবনার নাম। গ্রামগুলোর পথ ধরে হাঁটলে বাতাসে ভেসে আসা পানের সেই চেনা সুবাস যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, পরিশ্রম আর মাটির প্রতি ভালোবাসা কখনও বিফলে যায় না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত