
বসতবাড়ির আঙিনায় শুধু শখের বশেই মাল্টা গাছ লাগিয়েছিলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের গৃহিণী শিরিনা আক্তার। পরিবারের ফলের চাহিদা মেটানো আর বাড়ির আঙিনাকে সবুজ রঙে ভরিয়ে তোলাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। তবে সেই শখের চারাটি যে এত দ্রুত তার জন্য বড় এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। আজ তার আঙিনার মাল্টা গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে সোনালী ফল। পাতার ফাঁকে ফাঁকে হলুদ হয়ে আসা এই মাল্টা শুধু তার বাড়ির সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং মেহার গ্রাম ও আশপাশের মানুষের নজর কেড়েছে।
শিরিনা আক্তারের আঙিনার গাছটিতে এখন শোভা পাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে মাল্টা। রোদে ঝিলমিল করা কাঁচা-পাকা ফলের ভারে নুয়ে পড়ছে গাছের পাতাসহ সরু ডালপালা। স্থানীয় বাজার কিংবা দোকান থেকে কেনা আমদানিকৃত মাল্টার মতো এটি হয়তো একদম কড়া মিষ্টি নয়, তবে হালকা মিষ্টি ও রসালো স্বাদের এই ফল মন ভরিয়ে দেয় সহজেই। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, ফলের গায়ে কেমিক্যালের কোনো কৃত্রিম প্রলেপ নেই। গাছে পেকে প্রাকৃতিক নিয়মেই মাল্টাগুলো সুন্দর হলুদ রূপ ধারণ করেছে। বিষমুক্ত ও টাটকা ফল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিরিনা আক্তারের বাড়ি এখন প্রতিবেশি মানুষের আনাগোনায় মুখরিত। প্রতিদিন আশেপাশের বাড়ির লোকজন অনেকেই তার কাছে ছুটে আসছেন এই বিষমুক্ত মাল্টা কেনার জন্য। গাছের নিচ থেকেই খুচরা আমেজে তারা নিয়ে যাচ্ছেন তাজা ফল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাজারে যেসব ফল পাওয়া যায় সেগুলোতে প্রায়শই ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা ফরমালিনের ভয় থাকে। কিন্তু শিরিনার গাছের মাল্টায় কোনো প্রকার কীটনাশক বা রাসায়নিক সারের ব্যবহার করা হয়নি। ফলে এতে মিষ্টতা কিছুটা কম থাকলেও এটি সম্পূর্ণ খাঁটি ও স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই বিশুদ্ধ মাল্টা তারা নিশ্চিন্তে পরিবারের ছোট-বড় সবার মুখে তুলে দিচ্ছেন। নিজে হাতে রোপণ করা গাছের এই অভাবনীয় ফলনে উৎফুল্ল শিরিনা আক্তার নিজেও। নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানান, কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয়, একেবারে মনের আনন্দে শখের বশেই বাড়ির আঙিনার ফাঁকা জায়গায় মাল্টা গাছটি রোপণ করেছিলেন।
গাছটিতে যে কখনও এত বিপুল পরিমাণে ফল আসবে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে গাছের প্রতিটা ডালে যেভাবে ফলের বাম্পার ফলন হয়েছে, তা দেখে তিনি আনন্দে অভিভূত। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে এখন এই ফল তিনি প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রিও করতে পারছেন, যা তাকে এক অন্যরকম আর্থিক ও মানসিক তৃপ্তি দিচ্ছে। ছোট একটি গাছের এই আশাব্যাঞ্জক ফলন শিরিনা আক্তারের চিন্তাভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ঘরের কোণে শখের চাষ থেকে এবার তিনি তাকাচ্ছেন দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠের দিকে। শিরিনা এখন জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষি জমি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষের।
তার বিশ্বাস, সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজের জমিতে মাল্টা বাগান গড়ে তুলতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে তিনি দারুণ সফলতা অর্জন করতে পারবেন। চান্দিনার মাটি ও আবহাওয়া যে মাল্টা চাষের জন্য কতটা উপযোগী, তার জলন্ত প্রমাণ শিরিনার এই আঙিনার গাছটি।
শিরিনা আক্তারের এই সাফল্য এখন মেহার গ্রামসহ চান্দিনার অনেক গৃহিণী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
বসতবাড়ির অনাবাদী পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে বিষমুক্ত ফল উৎপাদন করা যায় এবং পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ খুঁজে নেওয়া যায়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন তিনি। মেহার গ্রামের শিরিনার ঝুলন্ত মাল্টার থোকা এখন শুধু একটি গাছের দৃশ্য নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।