
সরকারের গুদামগুলোতে চালের মজুত প্রায় ২১ লাখ মেট্রিক টনে উঠেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। রেকর্ড গড়া এ মজুত সরকারকে খানিকটা স্বস্তি দিলেও বাজারে চড়া দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষকে চাল কিনতে গিয়ে ভুগতেই হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দাম না কমলেও চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে; কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। দাম এর চেয়ে কমে গেলে কৃষকরা ধান আবাদে নিরুৎসাহিত হবে; তাতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে যাওয়ার শঙ্কার কথাও শুনিয়েছেন তারা। সরকার মনে করছে, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও আমদানি বাড়ায় মূলত মজুত অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আগামীতে মজুত আরও বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেছেন, নানা সংকটের মধ্যে চালের রেকর্ড মজুত স্বস্তি দিচ্ছে সরকারকে। খাদ্য নিরাপত্তায় সরকার ভালো ব্যবস্থাপনা করেছে। আমদানির পাশাপাশি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তুলেছে। সাধারণত এই সময় দেশে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকে, যা আউশ ও আমন ধান না ওঠা পর্যন্ত বেশি থাকে। কিন্তু এবার না বেড়ে স্থিতিশীল রয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জাহাঙ্গীর আলম।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত সোমবার পর্যন্ত দেশের সরকারি গুদামগুলোয় সব মিলিয়ে ২৪ লাখ ৩ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন খাদ্য মজুদ ছিল। এর মধ্যে চাল ২০ লাখ ৮৪ হাজার ৭৮১ টন, গম ২ লাখ ৪৮ হাজার ২৪১ টন ও ধান ১ লাখ ৮ হাজার ১৯৭ টন। বর্তমান মজুতকে ‘সন্তোষজনক’ হিসেবে তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বোরো সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে।
গত ১৭ অগাস্ট পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৫ লাখ ৮৩ হাজার ৮৩৫ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধান, ১১ লাখ ১৬ হাজার ৩০২ টন সেদ্ধ চাল, ৯১ হাজার ২১৯ টন আতপ চাল এবং ৫২৩ টন গম সংগ্রহ করা হয়েছে। গত মে মাস থেকে বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এর মধ্যে ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ সংগ্রহ অভিযানের আরও প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি আছে; ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত চলবে।
তথ্য বলছে, ধান সংগ্রহে এরই মধ্যে লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে। চাল সংগ্রহেও লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের দেড় মাসে (১ জুলাই থেকে ১৭ অগাস্ট) ৫ লাখ ৪৯ হাজার ১১০ টন খাদ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৭৩০ টন চাল ও ৫ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ টন গম।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৮৬ লাখ ২ হাজার ৮০ টন খাদ্য আমদানি হয়েছিল। যার মধ্যে চাল ছিল ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টন; ৭৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯০ টন ছিল গম।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতি বছরই আমন ও বোরো মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার পর অগাস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের গুদামে খাদ্যের মজুদ বাড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সন্তোষজনক মজুত থাকে। এরপর সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচির অধীনে চাল-আটা বিতরণ ও বিক্রির কারণে এই মজুত কমতে থাকে। মজুত বেশি কমে গেলে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে শুরু করে। গত মে মাসে ভারি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় বোরো ধানের বেশ ক্ষতি হয়। আশঙ্কা করা হয়েছিল, এতে চালের দাম বেড়ে যাবে। আমদানি অব্যাহত থাকায় সেটা হয়নি।
খাদ্য কর্মকর্তারা মনে করেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারের গুদামগুলোতে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ থাকলেই যথেষ্ট। গত সোমবার ঢাকার কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও শেওড়াপাড়া বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই-আড়াই মাস চালের দামে তেমন হেরফের হয়নি। মোটা ও সরু— সব চালের দামই স্থিতিশীল রয়েছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের চাল ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘মোটা চাল পাইজাম, স্বর্ণা, সরু চাল নাজিরশাইল, মিনিকেট— সব চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।’ একই কথা বলেন কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক।
তবে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, চালের দাম কিছুটা কমেছে। টিসিবি প্রতিদিনের খুচরা বাজার দর প্রকাশ করে। সে অনুযায়ী, সোমবার ঢাকার বাজারগুলোয় প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি মানের চাল বিক্রি হয় ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায়। আর সরু চালের মধ্যে নাজিরশাইল ও মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮৫ টাকায়।
টিসিবির হিসাবে, ১ মাসে মোটা চালের দাম কমেছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ; ১ বছরে কমেছে ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ।
মাঝারি মানের চালের দাম এক মাসে কমেছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ; বছরে কমেছে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর নাজিরশাইল ও মিনিকেটের দাম মাসে কমেছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ; বছরের ব্যবধানে কমেছে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলছেন চালের দাম কমেছে। আর সে কারণে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
গত ১২ অগাস্ট শেরেবাংলা নগরে চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “মূল্যস্ফীতির যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে আমি দুইটা জিনিস পরীক্ষা করে দেখেছি। চালের দাম কমেছে। মাংসের দাম কমেছে। আমরা পুনর্বার যাচাই করেছি। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির যে তথ্যটা দেওয়া হয়েছে, সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিকসের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চালের দাম কমেছে না বলে বাড়েনি বলা যেতে পারে। প্রতি বছরই এ সময় চালের দাম বাড়ে। এবার বাড়েনি। আমি মনে করি, এটাই একটা ভালো দিক।”
সেপ্টেম্বরের শেষে আউশ ধান উঠবে। আমন ধান উঠবে নভেম্বরের মাঝামাঝি। মাঝের এই সময়টা চালের দাম যেন না বাড়ে, সেজন্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি সরকারকে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।
“আমার হিসাবে, মে মাসে ভারি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় এবার বোরো ধানের উৎপাদন ১০ শতাংশ কম হয়েছে। এর পরও দাম বাড়েনি; স্থিতিশীল রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার ভালো ম্যানেজমেন্ট করেছে বলে আমি মনে করি,” বলেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, “২৪ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুদ দেশে আর কখনই ছিল না। এর মধ্যে প্রায় ২১ লাখ টনই চাল। কোনো অজুহাত করে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে যেন চালের দাম না বাড়ায়, সে দিকে এখন সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।”
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী গত মঙ্গলবার রাতে বলেন, “দেশে চালের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সচল রয়েছে। সরকারের হাতে বর্তমানে ২৪ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২১ লাখ চাল, যা আপৎকালীন মজুদের প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি বলেন, চলমান ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি মজুদ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান সংগ্রহ হয়েছে। চাল সংগ্রহও লক্ষ্যের চেয়ে বেশি হবে।
“একটা বিষয় আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, চাল বা খাদ্য নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।” প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে এবার আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করেছি। মাঠ পর্যায়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি; সমস্যা হয়নি। সে কারণেই রেকর্ড মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।”
এত মজুদের পরও চালের দাম কমছে না কেন— এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দেখেন, কৃষকদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। চালের দাম কমেনি মেনে নিলাম; কিন্তু বাড়েনি, স্থিতিশীল আছে— এটা তো সবাই দেখছে।
“বেশি কমে গেলে কৃষক দাম পাবে না। পরে আবাদ কমবে। তখন কিন্তু আমরা সবাই সমস্যায় পড়ব। তাই কৃষক, ভোক্তা সবার চিন্তা করে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমাদের সরকার সেটাই করছে।”
এবার সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দরে সংগ্রহ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার নির্ধারিত দাম কৃষকদের কাছে লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু উদ্যোগের সুফল মিলেছে এবার বোরো সংগ্রহে। তিনি বলেন, “আমাদের বস্তা ও মজুদ সক্ষমতা কম থাকার পরও কৃষকদের ধান ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। কৃষকের বস্তায়ও চাল নেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে সরকারি বস্তায় মজুদ হয়েছে।