
রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, গত রোববার বিকাল ৫টার দিকে দুই আসামিকে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। আসামিরা হলেন- মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা দুজনই নিহত পরিবারের বাড়ির আশপাশের এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়। পরিদর্শক মিলন চ্যাটার্জি বলেন, ‘দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ফলে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।’ এর আগে শনিবার রাতে কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর গত রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকার ২৩ বছর বয়সী মুগ্ধ দাস এবং তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে ১৯ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ দাসকে আটকের কথা জানায় পুলিশ। তাদের মধ্যে সিদ্ধার্থ রংপুর নগরীর ‘পিকে জুয়েলার্স’ নামের একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। আর মুগ্ধ কর্মরত সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড : গত রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে অবস্থানের কারণ জানতে চান। এ সময় তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে আসামিরা।
‘গণপতির চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে গেলে মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলছেন, ‘মেয়েটিকে হত্যার সময় কয়েক মিনিট ধরে চেষ্টা করতে হয়েছে বলে আসামিরা জবানবন্দিতে জানিয়েছে। পরে ঘুমন্ত অবস্থায় ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।’
ফোন বন্ধ পেয়ে ছুটে আসে স্বজনরা : এদিকে শনিবার রাতে ফোনে পরিবারের কারও সাড়া না পেয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে ছুটে যান তার শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী ও তার স্বামী। তখন পুরো বাড়ি অন্ধকার ছিল। অনেক ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কারও সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে উঠে জানালার তালা ভেঙে ভেতরে তাকান পূজা। এ সময় ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। একই সঙ্গে ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বয়স ৬৫ বছর এবং তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলার বয়স ৫০ বছর। তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর বয়স ২৩ বছর এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের বয়স ১২ বছর। গত রোববার ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের দাহ করা হয়।
চারজনকে হত্যার ঘটনায় রোববার কোতয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি; অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলা হওয়ার দিনই পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করে পুলিশ।
গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর তারা ওই বাড়ির বাথরুমে গিয়ে গোসল করে। ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর ও শসা খায়। পরে সেখানেই আরও এক দফা ইয়াবা সেবন করে।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নিজেদের পরিচয় ও উপস্থিতির চিহ্ন মুছে ফেলতে দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করতে আগুন জ্বালানো হয়।
ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা : পুলিশের দাবি, স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়। স্বর্ণালংকার মন্দিরের পেছনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখে তারা। আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরে সেখান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ কমিশনারের দাবি, ‘নিজেদের আঙুলের ছাপ যেন না থাকে, সে জন্য নিহতদের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।’