
ষড়ঋতুর এই দেশে শরতের মাঝামাঝি সময় চলছে। কিন্তু প্রকৃতিতে নেই এই ঋতুর চিরচেনা স্বস্তি। কখনও তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরম, আবার হঠাৎ কালো মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ, নামে বৃষ্টি। কখনও কখনও দিনের বেলায় গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা, আবার সন্ধ্যা বা রাতে বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে গেলে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। ফলে ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না মানুষ।
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই দেশের আবহাওয়ায় এমন বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের, দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে চলতি সেপ্টেম্বর স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ থাকার কথা বলা হয়েছিল। মাসটিতে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকার পূর্বাভাস থাকলেও বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হলে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি ও স্থানীয় বন্যার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গরম ও বৃষ্টির এমন বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলেও পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বিরাজ করছিল।
একই সময়ে কোথাও ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বৃষ্টি হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সময়ে রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শরতের এই সময়ে দেশের এক অংশে বৃষ্টি, অন্য অংশে গরম দুই ধরনের আবহাওয়া একই সঙ্গে সক্রিয় থাকছে।
আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিকতার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও বৈশ্বিক কারণ কাজ করছে। মৌসুমি বায়ুর অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ বা লঘুচাপ, বাতাসে জলীয়বাষ্প, মেঘের গতিপথ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন সব মিলিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে আবহাওয়ার চরিত্র বদলে যেতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের তাপীয় ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। এতে চরম গরমের পাশাপাশি ভারী বৃষ্টি ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের মাত্রা, স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে এবং অতিরিক্ত তাপ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এবারের পরিস্থিতিতে এল নিনোর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, চলতি এল নিনো আগামী কয়েক মাসে খুব শক্তিশালী হতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না; এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তবে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এর প্রভাব তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনকে আরও অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, এবার এল-নিনো থাকায় আমাদের অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে গড় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তবে অল্প সমেয় বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছি। এছাড়া আমাদের মৌসুমি ধরণেও পরিবর্তন এসেছে। আগে জুন মাসে যেভাবে বৃষ্টি হতো, ইদানিং বর্ষার শুরুতে সেই তুলনায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত কয়েক বছরেও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। আগে বর্ষার শুরুতে টানা তিন থেকে চার দিন বৃষ্টি হতো, কিন্তু এখন আর সে রকম হয় না। আবার দেখা যায়, বর্ষাকালের শেষের দিকে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হয়। যেহেতু এ বছর একটি এল নিনোর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ হঠাৎ অতিবৃষ্টি এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার এল নিনোর প্রভাব, সাগরে একাধিক লঘুচাপ, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা এবং বর্ষার চরিত্র পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই বর্ষার শুরুতে বৃষ্টি কম হলেও পরে বেশি হচ্ছে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্তও বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ গত কয়েক বছর ধরেই বর্ষা তার আচরণ পরিবর্তন করছে।
বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশে তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মানুষের অস্বস্তি অনেক বেড়ে যায়। কারণ উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম শরীর থেকে সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হয় এবং গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসেও এ ধরনের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে গরমের অস্বস্তি বাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
শুধু অস্বস্তিই নয়, দীর্ঘ সময় গরমের মধ্যে থাকলে শরীরে পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব ও হিট এক্সহস্টশনের মতো সমস্যা হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে হিটস্ট্রোকও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতিরিক্ত তাপ হৃদ্?যন্ত্র, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং আগে থেকে থাকা হৃদ্?রোগ, ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গরম-বৃষ্টির পালাবদলে বাড়ছে সর্দি-জ্বর : আবহাওয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। একদিকে দিনের তীব্র গরম, অন্যদিকে হঠাৎ বৃষ্টি ও রাতের তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ শরীরকে বারবার ভিন্ন তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। ফলে অনেকের মধ্যে সর্দি, কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা ও শরীর খারাপের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে আবহাওয়া সরাসরি সব ধরনের জ্বর বা সর্দির কারণ এমনটি বলা ঠিক নয়। এসব অসুস্থতার পেছনে ভাইরাসসহ বিভিন্ন জীবাণু, সংক্রমণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাও ভূমিকা রাখে। কিন্তু তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও মানুষের ঘরের ভেতর-বাইরের চলাচলের ধরন বদলে গেলে কিছু সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বাড়ছে অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা : গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া অনেকের অ্যালার্জির সমস্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে। ঘরের ভেতর অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে ছত্রাক বা অন্যান্য অ্যালার্জেনের বিস্তার বাড়তে পারে। বাইরে বৃষ্টি ও গরমের পালাবদলের সঙ্গে বাতাসের গুণমান, ধুলা ও বিভিন্ন জৈব কণার উপস্থিতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবে পরাগরেণু ও বাতাসে থাকা জৈব কণার কারণে অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন পরাগরেণুর উৎপাদন ও উপস্থিতির সময়কালও প্রভাবিত করতে পারে, যা অ্যালার্জির উপসর্গ বাড়াতে পারে। ফলে যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা, অ্যালার্জি, সাইনোসাইটিস বা অন্য কোনো শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, আবহাওয়ার এমন ওঠানামায় তাদের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। নাক বন্ধ হওয়া, হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ চুলকানো, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে : বৃষ্টি ও গরমের আরেকটি বড় প্রভাব মশার বংশবিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত। হঠাৎ বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকলে এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে। আবার বৃষ্টির পর আর্দ্র ও উষ্ণ পরিবেশ মশার জীবনচক্রের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি থামার পর বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, টব, ডাবের খোসা বা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা থাকলে এ ঝুঁকি আরও বাড়ে। শুধু ডেঙ্গু নয়, জলাবদ্ধতা ও অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে অন্যান্য পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।