
দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের হারানো উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ৮৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার একটি সংস্কার ও পুনর্বাসন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। দীর্ঘ সাত বছর ধরে আটকে থাকা সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইউনিট দুটি থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রায় ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের অতিরিক্ত পানি স্পিলওয়ে দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুটি ইউনিট থেকে মোট ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের যান্ত্রিক ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে ইউনিট দুটি থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা।
বিপিডিবির প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৬৫৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ, ২০০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা সরকারি তহবিল এবং ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট স্থাপন করা হয় ১৯৮৮ সালে। সর্বশেষ ২০১০ সালের জুনে একটি এবং ২০১১ সালের এপ্রিলে অন্য ইউনিটটির সংস্কার করা হয়েছিল। প্রকৌশলীদের মতে, সাধারণত প্রতিটি ইউনিটের ১০ বছর পরপর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রয়োজন। সে হিসাবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, ইউনিট দুটি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৮ সালে। এরপর সাত বছরের বেশি সময় পার হলেও বাস্তবায়ন শুরু করা যায়নি। এ সময়ে তিন দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিভিন্ন কারণে সেগুলো বাতিল হয়ে যায়। ইউনিট দুটি তোশিবার প্রযুক্তিতে নির্মিত হওয়ায় প্রযুক্তিগত শর্তপূরণে অন্যান্য কোম্পানির জটিলতা তৈরি হয়। পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্থানীয় ঠিকাদারদের আপত্তিসহ বিভিন্ন কারণে উদ্যোগটি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পূর্ণাঙ্গ ওভারহল ছাড়াই অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে ইউনিট দুটি চালু রাখতে হয়েছে।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বর্ষা মৌসুমে হ্রদের অতিরিক্ত পানি ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতি বছর বর্ষায় হ্রদের পানি বেড়ে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে স্পিলওয়ের গেট খুলে অতিরিক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে ছেড়ে দিতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার না করেই বের হয়ে যায়। কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরও প্রায় এক মাস ধরে স্পিলওয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির সর্বোচ্চ গেট খোলার সক্ষমতা সাড়ে তিন ফুট পর্যন্ত। এ অবস্থায় গেট দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি ছাড়ার পাশাপাশি পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে হ্রদের পানি ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছালে অতিরিক্ত পানি স্পিল করতে হয়। অথচ এই পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, আগে এ ধরনের পানি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সে সময় বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি। এবার নতুন করে ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের সংস্কার ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে স্পিল হওয়া পানির পরিমাণ কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরও বেশি পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।