
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের মাঠজুড়ে এখন শুধু সবুজ আর সবুজের হাতছানি। এই গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ নিজের জমানো ও বর্গা নেওয়া ছোট্ট জমির একটি অংশে বরবটি চাষ করেছেন। চার শতাংশ জমিতে করা সেই বরবটি ক্ষেতটি এখন নজর কাড়ছে সবার। ক্ষেতের গাছগুলো বেশ সতেজ ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাছগুলোতে থোকা থোকা ফুল আসতে শুরু করেছে। যদিও এখনও পুরোপুরি ফলন বা বরবটি ধরতে শুরু করেনি, তবুও কৃষকের চোখে-মুখে বইছে স্বস্তির ও আনন্দের ঝিলিক। আব্দুল হামিদের মতো চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এবার ব্যাপক হারে বরবটিসহ নানা শীতকালীন ও রবিশস্যের চাষ করা হয়েছে। মাঠের পর মাঠ কৃষকদের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এসব ফসলের ক্ষেত দেখে মনে হয় এক অপার সম্ভাবনার ক্যানভাস। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর সবজিগুলোর বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য বেশ ভালো হয়েছে। কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর প্রকৃতির অনুকূল রূপই যেন এবার তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। কৃষক আব্দুল হামিদ আশাবাদী কণ্ঠে জানান, তার ক্ষেতের গাছগুলো যেভাবে তরতর করে বেড়ে উঠছে, তাতে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গাছগুলোতে ফলন আসা শুরু করবে। তিনি প্রতিদিন ভোরে ও বিকালে ক্ষেতে গিয়ে যত্ন নেন, গাছের গোড়ায় পানি দেন এবং নিয়মিত পরিচর্যা করেন। তার এই নিবিড় পরিচর্যার সুফলও তিনি হাতেনাতে পাবেন বলে বিশ্বাস করেন। বিশেষ করে বর্তমান বাজারে অন্যান্য সবজির তুলনায় বরবটির দাম একটু চড়া রয়েছে। বাজারে যদি আর কিছুদিন এই দাম বজায় থাকে, তবে তিনি বেশ ভালো একটা লাভ করতে পারবেন। এই লাভ দিয়ে সংসারের অভাব-অনটন দূর করার পাশাপাশি আগামী মৌসুমের চাষাবাদের খরচও তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। শুধু মেহার গ্রামেই নয়, চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বহু কৃষক এবার বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষে ঝুঁকেছেন। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর আবহাওয়া অত্যন্ত অনুকূলে ছিল। কোনো ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অতিবৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়নি তাদের। ফলে ফসলের ক্ষেত নষ্ট হওয়ার শঙ্কা অনেক কম ছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে বর্তমানে যেসকল সবজি চাষ করা হচ্ছে, সেগুলোর ফলন বেশ ভালো দিচ্ছে। বাজারে এখন হয়তো কিছু সবজির দাম আগের তুলনায় কিছুটা কম, কিন্তু ফলন এতটাই বেশি হচ্ছে যে লাভের অঙ্কে তার প্রভাব পড়ছে না। উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কমলেও কৃষকদের তেমন একটা আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে না। বরং বাম্পার ফলন তাদের দুশ্চিন্তা দূর করে মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
বিশেষ করে মাটি ও আবহাওয়ার সাথে মানানসই ফসল নির্বাচন করায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পাচ্ছেন। বরবটি একটি স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল হওয়ায় অল্প সময়েই এর সুফল পাওয়া যায়। কৃষকদের এই পরিশ্রম এবং সফলতার পেছনে স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরোপকারী পরামর্শ ও সহযোগিতা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের খবরাখবর নিচ্ছেন এবং যেকোনো সমস্যায় তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন। চান্দিনার গ্রামাঞ্চলের মাঠঘাট এখন কৃষকদের স্বপ্ন বোনার কারখানায় পরিণত হয়েছে। আব্দুল হামিদের মতো প্রান্তিক ও মাঝারি কৃষকদের এই অদম্য উৎসাহ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করে তুলছে। সবুজ পাতার আড়ালে উঁকি দেওয়া হলুদ ফুলগুলো যেন কৃষকের সোনালী ভবিষ্যতেরই হাতছানি দিচ্ছে। বরবটি ক্ষেতের এই সতেজ রূপ আর কৃষকদের বুকভরা আশা প্রমাণ করে যে, সঠিক আবহাওয়া, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। চান্দিনার মেহার গ্রামের এই বরবটি চাষ এখন শুধু আব্দুল হামিদের নয়, বরং এলাকার প্রতিটি কৃষকের চোখে নতুন এক সমৃদ্ধির স্বপ্ন এঁকে দিচ্ছে।