
কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে 'সার কার্ড' চালু করতে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরইমধ্যে কৃষক বান্ধব 'সার কার্ড' চালুর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে ঝিনাইদহ জেলা কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, ফসলের আবাদ অনুযায়ী সারের সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার অনেক কৃষকই জানেন না। ফলে ফসলের জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় কৃষকেরা দ্বিগুণ সার ব্যবহার করেন। এ ছাড়া কৃষকদের ধারণা নির্ভর ও সনাতন পদ্ধতিতে ফসলে অতিরিক্ত সার প্রয়োগের ফলে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও ব্যাহত হয়। ফসল আবাদেও কৃষকদের গুনতে হয় অতিরিক্ত খরচ।
তিনি জানান, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস, সারের অপচয় রোধ ও মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ ধরে রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। উদ্যোগের অংশ হিসেবে, এরই মধ্যে জেলার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) এর সব সার ডিলারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় ডিলারদের আওতাধীন এলাকার কৃষকদের নির্ধারিত 'সার কার্ড' প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। সার কার্ডে প্রত্যেক কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ছবি ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকবে। ওই কার্ড দেখিয়ে কৃষক, ডিলার ও সাব-ডিলার বিক্রয় কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত হারে সার কিনতে পারবেন।
কৃষি বিভাগের মতে, কার্ডের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হলে একজন কৃষক তার কতটুকু আবাদি জমিতে কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করছেন, সেই ব্যাপারে কৃষি বিভাগ একটি ধারণা পাবে। পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী সার ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া কৃষকরা যেন অতিরিক্ত সার ক্রয় করে তামাক বা অননুমোদিত ফসলের আবাদে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে জেলার সদর উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে জেলার সব এলাকায় বাস্তবায়ন করবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকির মাধ্যমে এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশপত্রে বলা হয়েছে, প্রতি বিঘা জমিতে ধান, গম, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল চাষে একজন কৃষক কী পরিমাণ ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার ব্যবহার করতে পারবেন, সে সম্পর্কে নির্দেশনা কার্ডে সংযোজন করা হয়েছে। ফলে সহজেই কৃষক প্রয়োজন মতো সার সংগ্রহ করতে পারবেন। এ ছাড়া প্রতিবার সার উত্তোলনের সময় কার্ডে সারের পরিমাণ, ফসলের নাম ও বিতরণের তারিখ লিখে রাখা হবে। ফলে একজন কৃষক নির্ধারিত মাত্রার বেশি সার নিতে পারবেন না।
চলতি আমন মৌসুমের শুরু থেকে ঝিনাইদহের কৃষকেরা চাহিদা মতো সার পেয়েছেন। এতে চলতি মৌসুমে ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। তবে জেলার অন্যান্য ফল-ফসল চাষিরা চাহিদা মতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছিলেন। কৃষকদের অভিযোগ আমলে নিয়েই জেলায় 'সার কার্ড' চালুর উদ্যোগ নেয় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরই মধ্যে বিএডিসি ও বিসিআইসি সার ডিলারদের আওতাধীন জেলার বিভিন্ন এলাকায় 'সার কার্ড' তৈরি শুরু হয়েছে। কৃষি বিভাগের এই উদ্যোগে সারের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত ব্যবহার রোধ করা যাবে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কার্ড চালুর ফলে প্রকৃত কৃষকদের চাহিদামতো সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যাবে। একইসাথে অতিরিক্ত সার ব্যবহার ও অবৈধ মজুত রোধ করা যাবে।
সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের কৃষক মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে ধান, কলা, ড্রাগন ফলসহ নানা রকম ফসল আবাদ হয়। আমারও একাধিক ফসলের চাষ রয়েছে। ফসল অনুযায়ী সারের চাহিদা কখনও বাড়ে, আবার কখনো কমে। আমরা চাহিদা মতো সার পেলেই খুশি। কিন্তু অনেক সময় কিছু কিছু কৃষক অতিরিক্ত সার নেওয়ার ফলে অনেক কৃষক সার পায় না। সার কার্ড চালু হওয়ায় এবার হয়তো শৃঙ্খলা ফিরবে।
রামনগর গ্রামের কৃষক খানজাহান আলী বলেন, অনেকেই মনে করে জমিতে বেশি সার দিলে ফসল ভালো হয়। কিন্তু এই ধারণাটি ভুল। জমির উর্বরতা, পরিবেশ ও আবাদি ফসলের ওপর নির্ভর করে জমিতে সার দিতে হয়। অনেক কৃষক এখনও ধারণার ভিত্তিতে সার ব্যবহার করেন। আশা করছি, সার কার্ড চালু হলে সবার ভোগান্তি কমবে। কৃষক তার প্রয়োজন অনুযায়ী সার পেলে আমাদের আর কোনো চাওয়া নেই।
জেলার শৈলকূপা উপজেলার ত্রিবেনী ইউনিয়নের সার ডিলার জাফর মোল্লা বলেন, সার কার্ড চালুর মাধ্যমে কৃষকদের জমির পরিমাণ ও সার প্রয়োগের হার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। এই তথ্য সংরক্ষণ করে কৃষক পর্যায়ে সারের পরিমিত ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও সহজ হবে। কার্ডের মাধ্যমে সার বিতরণ বা বিক্রি করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়বে। সরকারি নির্দেশনা মেনে প্রকৃত কৃষকদের কাছে সঠিক পরিমাণে সার পৌঁছে দিচ্ছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, সার বিতরণে আমরা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পেয়ে থাকি। ওইসব অভিযোগ আমলে নিয়েই মূলত সার বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে 'সার কার্ড' চালু করা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা এ নিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ফসলভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে। একইসাথে জমির প্রকৃতিও রক্ষা পাবে। কৃষকরা অনেক সময় না বুঝে ফসলে অতিরিক্ত সার ব্যবহার করেন। এতে ফসলের মান ও জমির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ে। সারের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে 'সার কার্ড' কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে জেলার সব কৃষককে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।