
অর্থবছর ২০২৬-২৭ এর জাতীয় বাজেটে ঘোষিত শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রাথমিক প্রভাবে রাজধানীর খুচরা বাজারে ইতোমধ্যে খোলা সয়াবিন তেল, দেশি পেঁয়াজ ও ব্রয়লার মুরগিসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমেছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সর্বশেষ দৈনিক বাজারদর প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে অথবা স্থিতিশীল রয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব ও সরবরাহসংক্রান্ত উদ্যোগে বাজারে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সিপাহীবাগ, মিরপুর-৬, মোহাম্মদপুর টাউন হল, নিউ মার্কেট, রামপুরা ও মহাখালী এলাকার খুচরা বাজারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত টিসিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৩৫-৪৫ টাকায় নেমেছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮৬-১৯২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১৬০-১৮০ টাকা, আমদানি করা রসুন ১২০-২১০ টাকা, দেশি আদা ১৩০-১৬০ টাকা এবং শসা ৫০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কয়েকটি পণ্যের দাম সামান্য বেড়েছে। দেশি রসুন কেজিপ্রতি ৯০-১৪০ টাকা, কাঁচামরিচ ৮০-১৪০ টাকা এবং বেগুন ৭০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। সরু চাল (নাজির/মিনিকেট) কেজিপ্রতি ৭২-৮৫ টাকা, মাঝারি চাল (পাইজাম/আটাশ) ৫৫-৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট মসুর ডালের দাম কেজিপ্রতি ১৫০-১৬০ টাকা এবং বড় মসুর ডালের দাম ৯০-১০৫ টাকা। গরুর মাংস ৭৮০-৮৫০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০-১ হাজার ৩৫০ টাকা, চিনি ১০৫-১১০ টাকা এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ ৩৮-৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে উৎসে কর প্রত্যাহার এবং কয়েকটি খাদ্য ও কৃষিপণ্যের অগ্রিম কর কমানোর মতো বাজেটের পদক্ষেপের ফলে আমদানি ব্যয় কমতে শুরু করেছে এবং বাজারে আস্থা বাড়ছে। এই কর-সুবিধার আওতায় চাল, গম, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, লবণ, মাছ, পোলট্রি পণ্য, আলু ও বীজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর লক্ষ্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মসলা, খেজুর, শিশুখাদ্য, সার, পশুখাদ্য, কীটনাশক এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের ওপর শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ছাড় দেওয়া হয়েছে, যাতে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় কমে।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম সম্প্রতি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায়নি। তিনি এর কৃতিত্ব সরকারের জনবান্ধব রাজস্বনীতিকে দেন। তিনি বলেন, ‘৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট জনকল্যাণকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ রয়েছে।’ রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ পণ্যের দাম স্থিতিশীল রেখেছেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং নতুন অর্থবছরের রাজস্ব-সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর হলে আমদানি ব্যয় আরও কমবে—এমন প্রত্যাশাও বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, সরকার বাজার তদারকি অব্যাহত রাখবে, যাতে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।’
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কর হ্রাসের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন আমদানি, দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা এবং কার্যকর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভোক্তারা সরকারের দেওয়া রাজস্ব-সুবিধার পূর্ণ সুফল পান। তারা আরও বলেন, নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতা রোধ করাও জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ (ওএসএল) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রাশেদুর রহমান বলেন, সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর থাকলে সরকারের শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণের পদক্ষেপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, কেবল আমদানি ব্যয় কমলেই খুচরা বাজারে দাম কমবে না। পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা মূল্য কারসাজির যেকোনো প্রচেষ্টা ঠেকাতে কার্যকর বাজার তদারকি অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন আমদানি ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকে।