ঢাকা সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বস্তিতে শিক্ষার আলো, পাঠশালায় বদলাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন

বস্তিতে শিক্ষার আলো, পাঠশালায় বদলাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন

রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকায় আরডিএ পার্কের বিপরীতে রেলওয়ে কলোনির বস্তি। চারদিকে ঘিঞ্জি বসতি, অভাব-অনটন আর জীবনসংগ্রামের চিত্র। দিনের শুরু হয় জীবিকার সন্ধানে, শেষ হয় কোনোমতে দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করে। কলোনির কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, আবার কেউ শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাঙারি সংগ্রহ করে সংসার চালান। এমন বাস্তবতায় এই বস্তির শিশুদের কাছে স্কুলে যাওয়া ছিল অনেকটাই বিলাসিতা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোনো বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষার আলো থেকে দূরেই ছিলেন তারা।

তবে সেই চিত্র এখন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। বস্তির শিশুদের জন্য তৈরি হয়েছে ‘বিকল্প পাঠশালা’। ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থা’র উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজের একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ বিনা পারিশ্রমিকে নিয়মিত পাঠদান করছেন। বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাধিক শিশু এখানে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। শুধু শিশুদের নয়, প্রতি শুক্রবার বস্তিতে বসবাসকারী বয়স্কদের জন্যও চালু হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে আশার আলো জ্বলে উঠেছে।

রাজশাহী রেলওয়ে কলোনির এই বস্তিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, এখানে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবারের বসবাস। কেউ কেউ জানান, তারা তিন-চার দশক ধরে এই এলাকায় বসবাস করছেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও তাদের সন্তানদের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা। ফলে অনেক শিশু অল্প বয়সেই পরিবারের আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাঙারি সংগ্রহে যায়, কেউ গৃহস্থালির কাজে সহযোগিতা করে, আবার কেউ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত হয়।

অভাবের সঙ্গে শিক্ষার এই দূরত্ব কমাতেই এগিয়ে আসে ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থা’ নামের এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংস্থাটির উদ্যোগে বস্তির মধ্যে একটি বিকল্প পাঠশালা নামে ১০০ স্কয়ার ফিটের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হলেও ধীরে ধীরে এতে যুক্ত হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রায় ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে শিশুদের পড়াচ্ছেন। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সপ্তাহে ছয় দিন চলে ক্লাস। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ দেওয়া হচ্ছে শিশুদের।

শুধু বইয়ের পাঠ নয়, শিশুদের বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে যোগ-বিয়োগ, বানান, হাতের লেখা, ড্রয়িংসহ প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় শেখানো হচ্ছে। এর ফলে যারা আগে স্কুলমুখী হওয়ার সুযোগই পায়নি, তারাও এখন নিয়মিত ক্লাসে আসছে। শিশুদের অনেকেই ভবিষ্যতে বড় হয়ে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। বিকল্প পাঠশালার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জেসমিনের কথায় উঠে এসেছে সেই পরিবর্তনের ছবি। সে বলে, ‘আমাগো এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিল না। এখন ভার্সিটির ভাইয়েরা আমাদের নিয়মিত পড়াশোনা করান। সপ্তাহে ছয় দিন আমরা স্কুলে আসি এবং ভাইয়েরা খুব ভালো পড়ায়।’

শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুলের কাছেও স্কুলটি এখন আনন্দের জায়গা। তার ভাষায়, ‘শনিবার সকালে শেখায়। এছাড়া প্রতিদিন বিকালে ক্লাস হয় আমাদের। অনেক কিছু শেখায়। যোগ, বিয়োগ, ড্রয়িং এবং বানান সবকিছুই এই স্কুল থেকে শেখানো হচ্ছে।’ শিশুদের এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসনুভা আমিন নিয়মিত এই স্কুলে ক্লাস নেন।

তিনি বলেন, এই এলাকাটি খুবই অবহেলিত। পাশের পদ্মা আবাসিক এলাকার অনেক বাসায় এখানকার মানুষ কাজ করেন। কেউ গৃহকর্মী, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন। তাদের শ্রমেই অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবন চলে। অথচ তাদের সন্তানরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তাসনুভা আমিন বলেন, আমি যখন জানতে পারি অবহেলিত এসব শিশুদের নিয়ে একটি কর্মসূচি শুরু হয়েছে, তখন থেকেই তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। নিজের সময় অনুযায়ী নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ তারাও আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে সমাজ কখনোই সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল হাসানও মনে করেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা সামাজিক দায়িত্ব।

তিনি বলেন, এখানকার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে। অল্প বয়সেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। কারণ এখানে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই অত্যন্ত দরিদ্র। শুধু বস্তির শিশু বলে তাদের অবহেলা করা হয়। অথচ এসব শিশুও সমাজের অংশ। তারা শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকবে- এটা আমরা চাই না। শিক্ষাবঞ্চিত এই শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ তৈরি হওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। স্কুল কমিটির উপদেষ্টা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে রাজশাহী রেলওয়ে কলোনির বস্তিতে থাকা শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানকার অনেক শিশু ১০-১২ বছর বয়সেই কাজে যুক্ত হয়ে যায়। তাদের সেই বাস্তবতা থেকে বের করে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পর এখানকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা এখন স্বপ্ন দেখছেন, তাদের সন্তানরাও পড়াশোনা শিখবে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যেতে পারবে। তবে শিক্ষার এই উদ্যোগের মধ্যেই নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বস্তিবাসীর মধ্যে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দিয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। এতে একদিকে যেমন বসবাসের জায়গা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে শিশুদের বিকল্প পাঠশালাটিও।

ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি এই বস্তি উচ্ছেদ করে, তাহলে এখানকার মানুষ কোথায় গিয়ে উঠবে? তাদের সন্তানরা কোথায় পড়াশোনা করবে? উচ্ছেদের আগে অবশ্যই তাদের সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আমরা চাই, মানুষগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পরই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। তিনি আরও বলেন, এত বড় একটি বস্তিতে আগে কোনো স্কুল ছিল না। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিনামূল্যে এসব শিশুকে পড়াচ্ছেন। এই উদ্যোগটি চালু রাখা গেলে বহু শিশুর জীবন বদলে যেতে পারে।

বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী রোজিনা বেগম বলেন, আমাদের এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিল না। সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি স্কুল চালু করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছে। আমরা চাই আমাদের ছেলে-মেয়েরা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। কিন্তু এখন শুনছি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাহলে আমরা কোথায় যাব, আমাদের সন্তানদের পড়াশোনাই বা কোথায় হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত