ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সিলেটের 'জারা'র কদর এখন বিদেশেও, রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা

সিলেটের 'জারা'র কদর এখন বিদেশেও, রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা

সিলেট অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় লেবুজাতীয় ফল (সাইট্রাস) 'জারা'। আকারে বেশ বড়, সুগন্ধে অনন্য। ওজনে কোনো কোনোটি দুই কেজিরও বেশি। স্থানীয়ভাবে এটি 'শাসনী' নামেও পরিচিত। একেকটি জারা স্থানীয় বাজারে মানভেদে ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা দামেও বিক্রি হয়। বড়, ডিম্বাকার, সুগন্ধি ও সুস্বাদু এই সাইট্রাস জাতীয় ফলটি এ অঞ্চলের মানুষের রসনা বিলাসের অন্যতম একটি উপকরণ।

সিলেটের পাহাড়-টিলায় উৎপাদিত এই লেবুজাতীয় ফলের কদর এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বিদেশেও বাড়ছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে সিলেটের জারা। তবে রপ্তানির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সিলেট অঞ্চলের মানুষের খাবারের সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িয়ে আছে এসব লেবুজাতীয় ফল। এর মধ্যে জারা আকারে বড়, ডিম্বাকার ও সুগন্ধি। এর খোসা দিয়ে সালাদ ও আচার তৈরি করা হয়। এলাচের মতো সুগন্ধযুক্ত শাসনীরও রয়েছে বিশেষ চাহিদা।

জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর ও চিকনাগুল বাজারে সড়কের পাশে জারা লেবুর পসরা সাজিয়ে বসেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বড় আকৃতির প্রতিটি জারা ওজনে দেড় থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা একেকটির দাম হাঁকাচ্ছেন ৩০০ থেকে হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের মূল টার্গেট দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলেটে আসা পর্যটকরা। স্থানীয় ভোজনরসিকরাও আসেন জারা কিনতে। হরিপুর বাজারের পাশে জারা বিক্রেতা আব্দুস সহিদ জাগো নিউজকে বলেন, 'জারা লেবু জৈন্তাপুরের কয়েকটি এলাকায় চাষ করা হয়। চাষিরা বাগান থেকে সরাসরি ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করেন। কিছু অংশ বাগান স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। এসব এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ লেবুজাতীয় ফল চাষের সম্পৃক্ত।' একই এলাকায় আরেক বিক্রেতা মাসুক মিয়া বলেন, 'গুটি জারা ওজনে দুই থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। মানভেদে সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। তবে পর্যটকরা কিনতে চাইলে কিছুটা ছাড় পাওয়া যায়। সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানেও বিক্রি হয় জারা লেবু। আকারভেদে প্রতিটি জারা বিক্রি হয় ৪০০ থেকে এক হাজার টাকায়। ছোট জারার দাম প্রতিটি ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

নগরীর লালবাজারের লেবু বিক্রেতা আলী আহমদ বলেন, 'প্রতিদিন বিভিন্ন জাতের লেবুজাতীয় ফল বিক্রি করে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা আয় হয়। প্রবাসীরা দেশে এলে বিক্রি বেড়ে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় পৌঁছায়।' বিদেশে এসব ফলের দাম দেশের তুলনায় অন্তত তিনগুণ বেশি বলে জানান তিনি। এ কারণে দেশে বেড়াতে আসা অনেক প্রবাসী ফিরে যাওয়ার সময় নিজেদের পছন্দের লেবুজাতীয় ফলটি কিনে নিয়ে যান। জারা চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীন মৌলভীবাজার জেলার সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবিত নতুন জাত 'বারি-১'। কয়েক বছরের গবেষণায় স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের জারা থেকে বাছাই করে এ জাত উদ্ভাবন করা হয়। তবে আরও কয়েকটি জাতে নিয়ে কাজ করছে সিলেটের জৈন্তাপুর সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র। গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জুটন চন্দ্র সরকার বলেন, 'সিলেটে মূলত কলস, পানি ও গুটি এই তিনটি জাতের জারা উৎপাদন হচ্ছে। তারমধ্যে গুটি জারা আকৃতিতে সবচেয়ে বড়। ওজনে আড়াই থেকে তিনকেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।' তিনি বলেন, 'জৈন্তাপুরের মাটি জারার জন্যই বিখ্যাত। অন্য এলাকায় একই জাতে চারা রোপণ করলেও ভালো ফলন হবে না। মাটির জন্যই এ অঞ্চলে জারার ফলন ভালো।' তিনি আরও বলেন, এতো দিন জারার বিভিন্ন ধরন স্থানীয় চাষিদের কাছে নানা নামে পরিচিত ছিল। আকার ও আকৃতির ভিত্তিতে বেশ কয়েক ধরনের নাম প্রচলিত ছিল। সেসব ধরন থেকে বাছাই করে নতুন বারিন-১ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। মৌলভীবাজার সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র থেকে এটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিলেটে ২৮১ হেক্টর জমিতে লেবুর ফলন হয়েছে তিন হাজার ৫৫৮ মেট্রিক টন। ১২৭ হেক্টর জমিতে জারা লেবু উৎপাদন হয়েছে এক হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন।

সিলেটের পাহাড়-টিলার মাটি ও আবহাওয়া জারাসহ লেবুজাতীয় ফল চাষের জন্য উপযোগী। জৈন্তাপুরের হরিপুর, শ্যামপুর, বাগেরখাল, শিকারখাঁ, চিকনাগুল, উমনপুর, পানিছড়া, ঠাকুরের মাটি ও কালিনঞ্জিবাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে জারা চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ও বানিগ্রামেও এ জাতের চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত