
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬ তম তিরোধান দিবসের ৩ দিনের অনুষ্ঠানমালা শেষ হয়েছে সোমবার। সাধুদের ভাবের হাট ভেঙ্গে গেছে সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। বিকেলে আখড়া ঘুরে দেখা গেছে, দুর-দূরান্ত থেকে আসা বাউলরা নিজ নিজ আস্তানা ছেড়ে বিছানাপত্র গুছিয়ে রওনা হয়েছে অনেকেই। তবে যাওয়ার আগে একে অপরের সাথে ভাব বিনিময়, ভক্তি-শ্রদ্ধা শেষে বেদনা-কষ্ট নিয়ে সকল বাউল ফকিররা আজ ফিরে যাে"ছন যার যার গন্তব্যে। রাত পোহালে পাখি বলে দেরে খাই দেরে খাই, দয়াল চাঁদ আসিয়া আমায় পার করে নেবে এমন সৌভাগ্য আমার কবে হবে, এমন গুরুবাদী, দেহতত্ব গানের আসর থাকবে না, থাকবে না এই বাউল ফকিরদের ভিড়।
শরীর ভেঙ্গে প্রাণের সাঁইকে ভক্তি দিয়েছেন তিনদিন তিন রাত। জ্ঞান দিয়েছেন, পেয়েছেন। আসার বেলায় অনেক আনন্দ থাকলেও বিদায়ের বেলায় এটা যেন শান্তির কষ্ট। বিদায় বেলায় কান্নাজড়িত কন্ঠে এমন কথা জানালেন বাউল ভক্ত নারী-পুরুষরা। আঁখড়া বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। গুরুকে বারবার প্রনাম ও নানা রকম ভক্তি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিদায় নেন শিষ্যরা। গুরু ভক্তি আর সিদ্ধ মন নিয়ে বিদায় নেয়ার সময় অনেক বাউল তাদের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আবার দেখা হবে সাঁইজির উদাসী ডাকের টানে আগামীর তিরোধান দিবসে। গুরু নহির সাঁই জানান, সাঁইয়ের জীবদ্দশায় শুধূমাত্র তার ভক্ত আর শিষ্যদের নিয়ে মুলত আড়াই দিনের উৎসব করতেন। সে নিময় মেনেই বাউলরা "ভাটাই আসে উজানে ফিরে যায় যে যার আপন নিবাসে"। প্রকৃত ভেকধারী বাউলরা সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে খোঁজ-খবরও রাখেন না। তাদেরকে মঞ্চে ডাকলেও তারা আসন ছেড়ে উঠেন না। সোমবার ভোরে সুর্য্য ওঠার আগেই অহিংস মানবতা প্রতিষ্ঠায় আপন মোকামে গুরুর চরণ ছুয়ে দিক্ষা নিয়ে ভক্তি নিবেদন করে শিষ্যত্ব গ্রহণ করবে অনেক বাউল। লালন আঁখড়ার আশে পাশে ও একাডেমীর নিচে যারা আসন গাড়ে তারা সাঁইকে ভক্তি আর আরাধনায় নিমগ্ন থাকে কখনো স্'ান ত্যাগ করেনা।
বিছানাপত্র হাতে নিয়ে কথা বলেন দিনাজপুরের বাউল গুর আকবর শাহ। প্রায় একযুগ বাড়িতে ফেরেন না তিনি। সংসার ধর্ম টানে না তাকে। বাড়ির কোন খবর রাখেন না। সারা বছর পথেই কেটে যায় এ ফকিরের। তবে মাঝে মধ্যে আসেন সাঁইজির ধামে। মনের তৃষ্ণা মেটাতে। পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে ফিনের ভবের বাজারে। তবে অনেক বাউল,সাধু আঁখড়া ছাড়লেও অনেকে গুরুর বাড়িতে থেকে যাবেন আরও কদিন। সমাজ-ইতিহাসের ধারায় বিচার করলে বলা যায়, গ্রামবাংলার মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ ছিলেন লালন ফকির। সামাজিক ভেদনীতি, শ্রেনী-বৈষম্য, বর্ণ, শোষণ, জাত-পাতের কলহ, সামন্ত নিগ্রহও সাম্প্রদায়িক বিরোধের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উ"চকন্ঠস্বর। লালনের নাম আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশে উ"চারিত হয়। একজন গ্রাম্য নিরক্ষর সাধকের এ অর্জন ও প্রতিষ্ঠা স্বভাবতই বিস্ময় জাগায় মনে। মানুষের প্রতি মানুষের শোষন-বঞ্চনা-অবিচারের চির অবসান কামনা করে সমাজমনস্ক সাধক লালন শ্রেণীহীন শোষনমুক্ত এক মানবসমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬ তম তিরোধান দিবসের ৩ দিনের অনুষ্ঠানমালা শেষ দিনে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো.তৌহিদ বিন-হাসান'র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, (এমপি)।