
ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের পরিবেশগত প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সংগঠনটি বলছে, উন্মুক্ত স্থানকে ভারি শিল্প এলাকায় রূপান্তর, জলাভূমি সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন এবং বিশেষ ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি ও জনস্বার্থ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
গত রোববার বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এমন উদ্বেগ জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের মাধ্যমে ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ এর ভূমি ব্যবহার, উন্মুক্ত স্থান, জলাভূমি ওভারলে জোন এবং ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে। এসব সংশোধনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব, নগরের প্রতিবেশগত ভারসাম্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও জনস্বার্থ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাপার মতে, ঢাকা মহানগর এরইমধ্যে বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান সংকোচন, জলাবদ্ধতা, নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের মতো বহুমুখী সংকটে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ড্যাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা সংশোধনের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং নাগরিকদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সংগঠনটি বলেছে, ড্যাপ শুধু ভূমি উন্নয়ন বা ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের দলিল নয়। এটি নগরের পরিবেশগত নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরস্পরবিরোধী নয়। পরিবেশগত ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া উন্নয়ন সিদ্ধান্তই টেকসই নগর গড়ে তুলতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রকাশিত গেজেটে শ্যামপুর এলাকার নির্দিষ্ট ভূমির পূর্বনির্ধারিত উন্মুক্ত স্থান শ্রেণি পরিবর্তন করে ভারী শিল্প এলাকা হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। উন্মুক্ত স্থান নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, বৃষ্টির পানি ধারণ ও মাটিতে অনুপ্রবেশ, বায়ুর মান উন্নয়ন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত বুড়িগঙ্গা নদীর পাশের এলাকায় ভারী শিল্প ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে নদীর পানি ও তীরবর্তী প্রতিবেশ ব্যবস্থায় দূষণের চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাপা। শিল্পবর্জ্য, তরল বর্জ্য নিঃসরণ, বায়ু ও শব্দদূষণ এবং ভারী যানবাহনের চলাচল স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। গেজেটে নদীর ফোরশোর-সংক্রান্ত শর্ত এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রের বিধান থাকলেও এসব শর্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে, তা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্প এলাকায় রূপান্তরের আগে পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, বিদ্যমান শিল্পের সম্মিলিত দূষণ, বিকল্প ভূমি ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং উন্মুক্ত স্থান হারানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে বাপা।
জলাভূমি ওভারলে জোন-সংক্রান্ত বিধান সংশোধন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, সংশোধিত বিধান বাস্তবায়নের ফলে বিদ্যমান জলাভূমি, নিম্নভূমি, প্রাকৃতিক জলাধার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাপার মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক জলাধার, খাল, নিম্নভূমি এবং পানি প্রবাহের সংযোগ ব্যবস্থার ক্রমাগত সংকোচন। প্রাকৃতিক জলাভূমি ও নিম্নভূমি বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, পানি প্রবাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব এলাকা ভরাট, ভূমির উচ্চতা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে আশপাশে জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে ভূমি উন্নয়ন বা স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার জলবিদ্যাগত বৈশিষ্ট্য, পানি ধারণক্ষমতা, প্রাকৃতিক প্রবাহ, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে বাপা।
এছাড়া পূর্বাচল ও ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫ অতিরিক্ত এফএআর প্রণোদনা দেওয়ার বিধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। বাপার মতে, এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও গণপরিবহন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অগ্নিনিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্মুক্ত স্থানের পর্যাপ্ততা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সংগঠনটি জানিয়েছে, এফএআর প্রণোদনার সিদ্ধান্ত শুধু ভূমির উন্নয়ন সম্ভাবনা বা অর্থনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ড্যাপ সংশোধনের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা হয়েছে কিনা, তা নিয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে বাপা। সংগঠনটির মতে, নগর পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহার, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং উন্নয়ন ঘনত্বের মতো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন, পরিবেশবাদী সংগঠন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য প্রভাবিত অংশীজনের মতামত নেওয়া জরুরি।
বাপা জানতে চেয়েছে, সংশোধনীগুলো প্রণয়ন ও অনুমোদনের আগে কী ধরনের গণশুনানি, কারিগরি পর্যালোচনা ও অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে এবং প্রাপ্ত মতামত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সংগঠনটির মতে, নগর পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও অর্থবহ জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ড্যাপ সংশোধনের আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে বাপা। সংশোধনী প্রস্তাবের উৎস, সংশ্লিষ্ট কারিগরি কমিটির পর্যালোচনা, রাজউকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত অনুসরণ করা ধাপগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা আরও হয়, সংশোধনের পরিকল্পনাগত যৌক্তিকতা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট সভার সিদ্ধান্ত, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং অনুমোদনের প্রাসঙ্গিক নথি প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
বাপা রাজউকের কাছে উন্মুক্ত স্থানকে ভারি শিল্প এলাকায় রূপান্তর, জলাভূমি ওভারলে জোন সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন এবং বিশেষ এফএআর প্রণোদনার পরিবেশগত ও পরিকল্পনাগত যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত ও কারিগরি মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় অপরিবর্তনীয় ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে, এমন নতুন উন্নয়ন অনুমোদন স্থগিত রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি আরও বলেছে, জলাভূমি, জলাধার, নদীতীর, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের বিদ্যমান সুরক্ষা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। পরিবেশগতভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে সংশোধনীগুলো পুনর্বিবেচনা, সংশোধন বা বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট গেজেট সংশোধনের প্রস্তাব, কারিগরি পর্যালোচনা, কমিটির সুপারিশ, অংশীজনদের মতামত, প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশের আগে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রাসঙ্গিক নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে বাপা। রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি ও নদী ব্যবস্থাপনা- সংশ্লিষ্ট সংস্থা, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, বাপা, পেশাজীবী সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত পরামর্শসভা আয়োজনের আহ্বানও জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি ড্যাপের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর ক্ষেত্রে কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন, পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য নগর নিশ্চিত করা। স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন সুবিধার তুলনায় নগরের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাপা সংশ্লিষ্ট গেজেট সংশোধনীর পরিবেশগত ও পরিকল্পনাগত পুনর্মূল্যায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে রাজউকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।