প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ এপ্রিল, ২০২৬
এ মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে বিশালতম গ্রহ-নক্ষত্র পর্যন্ত আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান এবং নিখুঁত পরিকল্পনার সাক্ষ্য দেয়। আল্লাহর এ সৃষ্টি নৈপুণ্য শুধু আকারের বিশালতায় নয়, বরং এর গভীর শৃঙ্খলা, বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের রূপায়ণে প্রকাশ পায়। প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ এবং মানুষের জন্য অফুরন্ত ভাবনার খোরাক। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিনরাতের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৯০)। অর্থাৎ যারা আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং বিশ্বজাহানের অন্যান্য রহস্য ও গুপ্ত বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন, তারা বিশ্বের স্রষ্টা ও তার পরিচালকের পরিচয় অর্জন করতে সক্ষম হন। তারা জেনে যান, বিশাল এ পৃথিবীর সুনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা ও সুব্যবস্থা; যাতে সামান্য পরিমাণও কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। অবশ্যই এর পেছনে এমন কোনো সত্তা আছেন, যিনি তা সূক্ষ্মভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করছেন।
মহাকাশ যেন মহাশৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি : আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতা বুঝতে গেলে প্রথমে মহাকাশের দিকে তাকাতে হয়। কোটি কোটি গ্যালাক্সি, অসংখ্য সৌরজগৎ এবং গ্রহ-উপগ্রহ এক সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলমান। সূর্য নিজের কক্ষপথে ঘোরে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এবং চাঁদ পৃথিবীকে। এ বিশাল বস্তুপুঞ্জের মধ্যে এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই। এ নিখুঁত শৃঙ্খলা প্রমাণ করে, এর নেপথ্যে এক মহাপরিকল্পনাকারী রয়েছেন, যিনি তাঁর সীমাহীন ক্ষমতা বলে এ মহাজাগতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাতদিন, সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে।’ (সুরা আম্বিয়া : ৩৩)। এ শৃঙ্খলাই মহান স্রষ্টার অপার সৃষ্টির প্রথম ও প্রধান বিস্ময়। এতে মহান আল্লাহর শক্তিমত্তার প্রকাশ পায়।
প্রকৃতির রূপ যেন সৌন্দর্যের লীলাভূমি : পৃথিবীর বুকে আল্লাহর সৃষ্টি আরও নিবিড় ও মনোরম। পাহাড়ের দৃঢ়তা, সমুদ্রের গভীরতা এবং মরুভূমির নিঃসঙ্গতা- সবই তাঁর অনন্য সৃষ্টির অংশ। প্রকৃতিতে বিরাজমান বৈচিত্র্য মানুষকে মুগ্ধ করে। একটি বীজ থেকে বিশাল বৃক্ষের জন্ম হয়, যা ফল ও ছায়া দেয়। প্রকৃতির এ সৌন্দর্য শুধু চোখকে তৃপ্তি দেয় না, বরং জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেন ও খাদ্য সরবরাহ করে। বিভিন্ন রঙের ফুল, বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী, নদ-নদীর অবিরাম বয়ে চলা- সবই আল্লাহর সুনিপুণ কারিগরির স্বাক্ষর। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর তা দ্বারা আমি সব রকমের উদ্ভিদের চারা উদগত করি; অতঃপর তা থেকে সবুজ পাতা উদগত করি। যা থেকে ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপাদন করি। আরও (নির্গত করি) খেজুর গাছের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি, আঙ্গুরের বাগান, জয়তুন ও আনার। একটার সঙ্গে অন্যটার মিল আছে, আবার নেইও। লক্ষ্য করুন ওগুলোর ফলের দিকে, যখন সেগুলো ফলবান হয় এবং সেগুলো পেকে ওঠার পদ্ধতির প্রতি। নিশ্চয় মোমিনদের জন্য এগুলোতে নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আনআম : ৯৯)। রাসুল (সা.) প্রকৃতির প্রতি সদয় হতে শিখিয়েছেন। তিনি অকারণে গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন।
মানবদেহ শ্রেষ্ঠতম শিল্প ও চিন্তার উৎস : আল্লাহর সৃষ্টির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বুদ্ধিদীপ্ত অংশ হলো মানুষ। মানুষকে দেওয়া হয়েছে চিন্তা করার ক্ষমতা, জ্ঞানার্জনের সুযোগ এবং ভালো-মন্দ বিচারের শক্তি। মানুষের শরীর বৃত্তীয় গঠন এক চরম বিস্ময়। প্রতিটি অঙ্গ, কোষ একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশে সাধন করে। প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কতটুকু নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে, চিন্তা করলে মাথা ধরে আসে। প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজ নিজ দায়িত্বে কখনও অবহেলা করে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।’ (সুরা তীন : ৪)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়, আল্লাহ প্রতিটি প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন নিচুমুখী করে। শুধু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আলম্বিত দেহ সোজা করে; যে নিজের হাত দিয়ে পানাহার করে। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যথোপযোগী বানিয়েছেন। তাতে পশুর মতো বেমানান ও অসামঞ্জস্য নেই। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে উচিত ব্যবধানও রেখেছেন। তাতে বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা, বোধশক্তি, প্রজ্ঞা, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন। ফলে মানুষ আসলে তাঁর কুদরতের প্রকাশস্থল এবং শক্তিমত্তার প্রতিবিম্ব। মানুষকে আল্লাহ শুধু দৈহিক সৌন্দর্যই দেননি, দিয়েছেন আবেগ, বিবেক এবং আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা। এ বোধ ও মনন মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করেছে এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পথও দেখিয়েছে। মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।’ (সুরা জারিয়াত : ৫৬)। অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টির উদ্দেশ হলো সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা। এ ইবাদতের জন্য চিন্তাশীল মানব মস্তিষ্কই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাফসিরে আহসানুল বয়ানে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এ আয়াতে সব মানুষ ও জিনকে জীবনের সেই উদ্দেশের কথা স্মরণ করানো হয়েছে, যেটাকে তারা ভুলে গেলে পরকালে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসিত হবে এবং এ পরীক্ষায় তারা অসফল গণ্য হবে, যাতে মহান আল্লাহ তাদেরকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন।
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৃষ্টি রহস্যের জগৎ : বিশাল মহাবিশ্ব ও মানবদেহ ছাড়াও আল্লাহর অসংখ্য সৃষ্টি রয়েছে; যা খালি চোখে দেখা যায় না। অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া যা জীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এ ক্ষুদ্র জগতের রহস্য উন্মোচন করছে। এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৃষ্টির মধ্যেও যে বিশাল ব্যবস্থাপনা ও জটিলতা লুকিয়ে আছে, তা দেখে আরও বেশি বিস্মিত হচ্ছে। আল্লাহ প্রশ্ন করেন, ‘তবে কি তারা উটের দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে, কীভাবে তা উত্তোলন করা হয়েছে? আর পাহাড়ের দিকে, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে?’ (সুরা গাশিয়াহ : ১৭-২০)। এ আয়াতগুলো ছোট-বড় সব সৃষ্টির মাধ্যমেই তাঁর নিদর্শন দেখতে উৎসাহিত করে।