
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এসব অর্থ সাধারণ আমানতকারীদের টাকা; তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা উদ্ধার করে আমানতকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় আজ এ আহ্বান জানান তিনি। সভায় তিনি আরও বলেন, সম্পদ পুনরুদ্ধারের এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। এ সময় কোনো চাপ সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সরাসরি গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
গভর্নর বলেন, দেওয়ানি কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকগুলোরই কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। তাই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে আমানতকারীদের অর্থ উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় টাস্কফোর্সের উপদেষ্টা ও গভর্নরের পরামর্শক ফারহানুল গনি চৌধুরী সম্পদ উদ্ধারের অগ্রগতি সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে ‘সিভিল অ্যাসেট রিকভারি স্ট্যাটাসের হালনাগাদ’ শীর্ষক বিষয় উপস্থাপন করেন। এতে টাস্কফোর্সের সদস্য, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান ও উপ-প্রধান নির্বাহীরা, বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ সরকার ফৌজদারি ও দেওয়ানি- এই দুই ধরনের আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে। ফৌজদারি কার্যক্রম সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো তাদের অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান ও মামলা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেওয়ানি মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। সভায় আরও জানানো হয়, সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ পাচার ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়ানি কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ছয়টি প্রধান মামলা নির্বাচন করা হয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে ১০টি ব্যাংক এরইমধ্যে ৯টি আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ এরইমধ্যে এ ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তবে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এখনও চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়ায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। তাদের এনডিএ স্বাক্ষর দ্রুত করার জন্য আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়। কিছু ব্যাংক এরইমধ্যে বিদেশে পাচার হওয়া ঋণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ শুরু করেছে। প্রথম ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০টির বেশি মামলা নিয়ে দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গভর্নর বলেন, দেওয়ানি কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকগুলোরই কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। তাই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে আমানতকারীদের অর্থ উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের বৈঠক : দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান সংকট নিরসনে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একটি প্রতিনিধিদল আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট নিরসনে প্রতি মাসের নগদ সহায়তার অর্থ সংশ্লিষ্ট মাসেই ছাড় করার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর। বিজিএমইএ’র এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান বহুমুখী সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেন।
প্রতিনিধিদলে বিজিএমইএ পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমান, পরিচালক ড. রশিদ আহমেদ হোসাইনী এবং মাহিন অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ-আল-মাহমুদ মাহিন উপস্থিত ছিলেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। অনেক ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ করলেও প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সরবরাহ করছে না। এতে কারখানা সচল রাখা এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজিএমইএ নেতারা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে নীতি সহায়তার আওতায় নগদ সহায়তার হার বাড়ানোর দাবি জানান। তারা বিশেষ নগদ সহায়তার হার ০.৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ, শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তার হার ১.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন।
এছাড়া প্যাকিং ক্রেডিটের (পিসি) সুদের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করা এবং এই তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রপ্তানি ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা এবং এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বিজিএমইএর প্রস্তাবনা ও শিল্পের সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে শুনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলোতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি জানান, নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে কোনো আবেদন আর পেন্ডিং রাখা হবে না। রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট নিরসনে প্রতি মাসের নগদ সহায়তার অর্থ সংশ্লিষ্ট মাসেই ছাড় করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় প্রতিনিধিদল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোতে জমাকৃত স্থায়ী আমানত ও রপ্তানি মূল্যের অর্থ নগদায়ন করতে না পারার বিষয়টিও তুলে ধরে বলেন, তারল্য সংকটের কারণে অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকির আশ্বাস দেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর। বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পদক্ষেপ পোশাক শিল্পকে বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করবে।