ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

শাওয়াল মাসের ছয় রোজার বিধান, নিয়ম ও ফজিলত

রায়হান রাশেদ
শাওয়াল মাসের ছয় রোজার বিধান, নিয়ম ও ফজিলত

রোজা শুধু রমজান মাসে নয়, সারা বছরই রাখা যায়। রমজানের রোজা ফরজ এবং ফজিলতের দিক দিয়ে সব থেকে বেশি মর্যাদাশীল। অন্যান্য মাসের রোজার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ফজিলতের কথা আছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রায়ই রোজা রাখতেন। তবে তিনি কিছু কিছু রোজার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। শাওয়াল মাসের ছয় রোজা এর মধ্যে অন্যতম।

শাওয়ালের রোজা রাখার বিধান : প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা সুন্নত। অনেকে মনে করেন, শুধু নারীরা এ রোজা রাখবেন, তাদের ধারণা সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়ালের ছয় রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদের রাখার নির্দেশ দিতেন। তাঁর সুন্নত অনুসরণে এ রোজা রাখা উত্তম। তবে না রাখলে কোনো অসুবিধা নেই। গুনাহ হবে না। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘আমাদের মাজহাবের আলেমদের বক্তব্য হলো, শাওয়ালের ছয় রোজা আদায় করা মুস্তাহাব।’

শাওয়ালের রোজা রাখার নিয়ম : শাওয়াল মাসের যে কোনো দিন এ রোজা রাখা যায়। তবে ঈদের দিন রোজা রাখা যাবে না। এ দিন রোজা রাখা হারাম। ঈদের পর দিন থেকেই রোজা রাখা যেতে পারে। একনাগাড়ে অথবা মাঝে ফাঁক দিয়ে পৃথকভাবেও রাখা যায়। মাসের মধ্যে ছয় রোজা রাখা হলেই এর সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে শাওয়ালের প্রথম দিকে একসঙ্গে ছয়টি রোজা রাখা উত্তম।

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘শাওয়ালের রোজা ধারাবাহিকভাবে একসঙ্গে মাসের শুরুতেই আদায় করা মুস্তাহাব। যদি ভিন্ন-ভিন্নভাবে রাখা হয় অথবা শাওয়াল চলে যাওয়ার পরে রাখা হয়, তবুও তা জায়েজ হবে।’

শাওয়ালের রোজার ফজিলত : শাওয়ালের ছয় রোজা রোখলে ১ বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, যে যেন এক বছর রোজা রাখল।’ (মুসলিম : ১১৬৪)। আবু আইয়ুব আল আনসারি (রা.) এ হাদিসের বিশ্লেষণ করে বলেছেন, রমজানের রোজার বিনিময়ে ১০ মাস এবং শাওয়ালের রোজার বিনিময় দুই মাস- মোট ১ বছরের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যাবে। কারণ, একটি সৎকাজের বিনিময়ে দশটি সওয়াব পাওয়া যায়। সাওবান (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান। সুতরাং এ হলো এক বছরের রোজা।’

রমজানের ৩০টি রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ৬টি রোজা যুক্ত হলে ৩৬টি রোজা হয়। ইসলামে প্রতিটি ভালো কাজের জন্য ১০ গুণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ আছে। ৩৬ রোজার ১০ গুণ হলো ৩৬০ রোজার সমান।

শাওয়ালের রোজার একটি ফজিলত হলো, এই রোজা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার একটি আলামত। রমজান মাসের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে কিছু রোজা রাখা একথার আলামত যে, আল্লাহতায়ালার দরবারে রমজানের রোজা কবুল হয়েছে। কেননা, আল্লাহতায়ালা যখন বান্দার কোনো আমল কবুল করেন, তখন অন্য একটি নেক আমলের তাওফিক দান করেন। সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) ও আরও কোনো কোনো সালাফের বক্তব্য হলো, নেক আমলের প্রতিদান হচ্ছে, এর পর আরও নেক আমলের তাওফিক পাওয়া। আর গোনাহের শাস্তি হলো, এর পর আরও গুনাহে লিপ্ত হওয়া। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া: ১০/১১)।

সালাফের এই কথার সমর্থন কোরআন মাজিদেই বিদ্যমান। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা হেদায়েতের পথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তাদের হেদায়েতে উৎকর্ষ দিয়েছেন এবং তাদের দান করেছেন তাদের (প্রয়োজনীয়) তাকওয়া।’ (সুরা মুহাম্মাদ : ১৭)।

আয়াতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হেদায়েত ও নেক আমলের পথে চললে আল্লাহতায়ালা তাকে আরও বেশি তাকওয়া ও হেদায়েতের তাওফিক দান করেন। হাদিস শরিফেও অনুরূপ এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধর। কেননা, সত্য আনুগত্যের দিকে নিয়ে যায়। আর আনুগত্য জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মানুষ সত্য বলতে থাকে এবং সত্যের জন্য চেষ্টা করতে। একপর্যায়ে আল্লাহর কাছে তার নাম লেখা হয় ‘ছিদ্দীক’।

তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাক। কেননা, মিথ্যা পাপের পথে নিয়ে যায়। আর পাপ জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। একসময় আল্লাহর নিকট তার নাম লেখা হয় ‘মিথ্যাবাদি’। (মুসলিম : ২৬০৭)

হাদিসের মধ্যে এসেছে, সত্য বলার আমল আরও অনেক নেক আমলের মাধ্যম হয়। যেমনভাবে মিথ্যা আরো গোনাহের দিকে নিয়ে চলে।

উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস থেকে জানা যায়, মানুষ যখন কোনো ভালো আমল করে তার জন্য আরো অনেক ভালো আমল করা সহজ হয়ে যায়। সুতরাং একটি ভালো আমলের পর আরেকটি ভালো আমলের তাওফিক হওয়া একথার অলামত যে, পূর্বের ভালো আমলটি আল্লাহ কবুল করেছেন। তাই তাকে আরও কিছু আমলের তাওফিক দান করেছেন। অতএব, রমজান মাসের পর শাওয়াল মাসে রোজা রাখা এ কথার একটি দলিল যে, তার রমজানের রোজা আল্লাহতায়ালা কবুল করেছেন।

রমজানের রোজার শুকরিয়া : আল্লাহতায়ালা যখন কোনো নেয়ামত দান করেন, এর দাবি হলো আল্লাহর জন্য কিছু ইবাদত করা। বিশেষ করে গোনাহমাফের শোকরস্বরূপ ইবাদত-বন্দেগি বাড়িয়ে দেওয়া নবী (সা.)-এর আমল দিয়ে প্রমাণিত। তিনি রাতের বেলা নামাজের মধ্যে এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর পা মোবারক ফুলে যেত। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি কেন এত কষ্ট করেন, আপনার তো আগে-পরের সব গোনাহ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি উত্তর দিয়েছেন, ‘আমার কি মন চায় না, আমি শোকরগুজার বান্দা হব?’ (বোখারি : ৪৮৩৭)।

রমজানের রোজা, রমজানের তারাবি ও অন্যান্য আমল মোমিন বান্দার গোনাহ মিটিয়ে দিয়েছে সুতরাং গোনাহমাফ ও অন্যান্য নেয়ামতের দাবি হলো, রমজানের রোজার পর আরও কিছু রোজা রাখা। এটাই হলো, এসব নেয়ামতের শুকরিয়া। সুতরাং আসুন, রমজানের রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের শোকরস্বরূপ শাওয়াল মাসে কিছু রোজা রাখি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত